আদিবাসীদের উপর হামলায় আটক ২ জনের মাথায় আঘাতের চিহ্ন নেই


ঢাকার মতিঝিলে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের উপর হামলার ঘটনার পর স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির দুই নেতা আরিফ আল খবির ও মো. আব্বাসের মাথায় ব্যান্ডেজ পরা দেখা গেলেও, তাদের গ্রেপ্তারের পর কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তারা দুজন আহত নন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (১৬ জানুয়ারি) মতিঝিল থানার ওসি মেজবাহ উদ্দিন গণমাধ্যমকে কথা জানান। তিনি আরও জানান, ‘সুস্থ অবস্থাতেইদুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনার জন্য মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

এনসিটিবি ভবনের সামনে বুধবার আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ব্যাপক মারধরের অভিযোগে ওই দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে তাদের কপাল মাথার অংশে ব্যান্ডেজ পরা দেখা গেছে।

পাঠ্যবই থেকেআদিবাসীশব্দযুক্ত চিত্রকর্ম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে পাঠ্যপুস্তক ভবনের সামনেসংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্রজনতাব্যানারে অবস্থান নেওয়াদের ওপর হামলা চালায় চিত্রকর্মটি বাদ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেওয়াস্টুডেন্টস ফর সভরেন্টিনামের একটি সংগঠন।

ওই ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে রাতেই দুই 'হামলাকারীকে' গ্রেপ্তারের তথ্য দেওয়া হয় সরকারের দুই উপদেষ্টার তরফ থেকে।

পরে বৃহস্পতিবার ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জিয়াদুর রহমানের আদালত শুনানি শেষে আটক দুজনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। 

ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে দিন তাদের ঢাকার আদালতে হাজির করা হয়। এরপর মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক কাজী আরমান হোসেন তাদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। আসামি পক্ষের আইনজীবী জামিন চেয়ে আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধীতা করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তাদের জামিন নাঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। 

ক্রিকেট স্ট্যাম্পে জাতীয় পতাকা বেঁধে আদিবাসীদের পিটুনি, সোশ্যালে নিন্দার ঝড়

 


পাঠ্যবই থেকেআদিবাসীশব্দযুক্ত গ্রাফিতি বাতিলের প্রতিবাদে আয়োজিত কর্মসূচিতে ক্রিকেট স্ট্যাম্পে জাতীয় পতাকা বেঁধে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের বেধড়ক পিটানোর অভিযোগ উঠেছে স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। বুধবার (১৫ জানুয়ারি), দুপুরে মতিঝিলের এনসিটিবি ভবনের সামনে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতার উপর হামলা চালায়।

হামলায় জন গুরুতর আহত এবং কমপক্ষে ১৫ জন আহত হন। জরুরিভাবে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। আহতরা হলেন ডন যেত্রা (২৮), অন্তত ধামাই (৩৫), ফুটন্ত চাকমা (২২), ইসাবা শুহরাত (৩২), রেংইয়ং ম্রো (২৭), রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা (২৫), ডোনায়ই ম্রো (২৫), জুয়েল মারাক (৩৫) শৈলী (২৭)

তাদের মধ্যে রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নির্বাহী কমিটির সদস্য বলে ফেসবুকে এক পোস্টে জানান সংগঠনটির মুখপাত্র উমামা ফাতেমা। তিনি বলেন, স্টুডেন্ট ফর সভরেন্টির হামলায় রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা গুরুতর আহত হয়েছেন।

এদিকে, ক্রিকেট স্ট্যাম্পে জাতীয় পতাকা বেঁধে আদিবাসীদের পেটানোয় সোশ্যাল মিডিয়ায় নিন্দার ঝড় উঠেছে। অনেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরব হয়েছেন।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন নিজের ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেজে লিখেছেন, ‘‘আগে শিক্ষার্থীদের এভাবে পেটাতো ছাত্রলীগ। ভেবেছিলাম এইসব অতীত হয়ে গেছে। এখনস্টুডেন্ট ফর সভরেন্টিনামে এরা কারা ফিরে এলো? হাতে ক্রিকেট স্ট্যাম্প আর মাথায় জাতীয় পতাকা। কল্পনা করতে পারেন জাতীয় পতাকার কি অপমান করেছে? এরা কারা আজ আদিবাসী শিক্ষার্থীদের এইভাবে পেটালো?’’


যোগ করে ঢাবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক আরও জানান, ‘‘এই হামলায় যারা যুক্ত ছিল তাদের সবাইকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। নচেৎ ধরে নিতে হবে বৈষম্য বিরোধী নামে যেই স্পিরিট নিয়ে আমরা অভ্যুথান ঘটিয়েছিলাম সেটার মৃত্যু ঘটেছে।’’

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘‘ঢাবিতে শিবির এতদিন ছাত্রলীগ সেজে নির্যাতন চালিয়েছে, এখন আসল রুপে ফেরার ট্রায়াল দিচ্ছে। আদিবাসী শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ সমাবেশে হামলার নিন্দা জানাই। জড়িতদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাদের গ্রেফতার করতে হবে।’’

হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘‘রাষ্ট্রকে সকল জাতিসত্তার সন্মান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আদিবাসী ছাত্র নেতাকর্মীদের উপর হামলাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনের বিচার চাই।’’



বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি প্রদীপ মার্ডি বলেন, ‘‘খুব সম্ভবত চিন্ময় দাসের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ এলিগেশন ছিল জাতীয় পতাকার অবমাননা। আজস্টুডেন্টস ফর সেভারেন্টিনামে আল্ট্রা ন্যাশনালিস্ট যারা স্ট্যাপের মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে আদিবাসীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা করে রক্তাক্ত করলো সেখানে কি পতাকার অবমাননা হয়নি?’’

‘রুপাইয়া তঞ্চঙ্গ্যার মাথার ১২টা সেলাই রাষ্ট্রের ক্ষতকে নির্দেশ করে’

 


ঢাকার মতিঝিলে এনসিটিবির কার্যালয়ের সামনে আদিবাসী ছাত্র-জনতার উপর হামলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নির্বাহী কমিটির সদস্য রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। তাঁর মাথায় ১২টা সেলাইয়ের প্রয়োজন পড়েছে। এই ১২টা সেলাই রাষ্ট্রের ক্ষতকে নির্দেশ করে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।

বুধবার সন্ধ্যায় শহীদ মিনারে সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতার উপর হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত জাতীয় নাগরিক কমিটির বিক্ষোভ মিছিলে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

সারজিস আলম বলেন, একই বিষয়ে বিপরীত চিন্তাভাবনা কিংবা বিপরীত মতামত নিয়ে একই জায়গায় দুইটা গ্রুপ প্রোগ্রাম নিলেও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী পূর্ব ব্যবস্থা নিতে পারেনি। হামলা হবার পরে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থান ছিল বাংলা সিনেমার মত। এই হামলার দায় সরকার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়কে নিতে হবে।

আদিবাসী ছাত্র-জনতার উপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে জাতীয় নাগরিক কমিটি। জাতীয় নাগরিক কমিটি মনে করে, আজকের সহিংসতার ঘটনায় ‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে পূর্বঘোষিত সমাবেশের সময় একই স্থানে কর্মসূচি ঘোষণা করে ‘স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি’ দায়িত্বশীল আচরণ করেনি। তাদের এমন সিদ্ধান্ত ইচ্ছাকৃত উত্তেজনা তৈরি করেছে। ঘটনাস্থলে সংঘটিত ঘটনাবলী থেকে এটা স্পষ্ট যে, এই হামলা পরিকল্পিত ছিল এবং এর পেছনে ‘স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি’র ভূমিকা ছিল স্পষ্ট। তাদের এই আচরণ শুধু সহিংসতার মাধ্যমে ভিন্নমত দমনের অপপ্রয়াস নয়, বরং এটি দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত।



জাতীয় নাগরিক কমিটি জোর দাবি জানায় যে, আহতদের যথাযথ চিকিৎসা এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি, এনসিটিবির সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার এবং সকল পক্ষের মতামত বিবেচনা করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক কমিটি।

পাঠ্যবই থেকে আদিবাসী শব্দযুক্ত গ্রাফিতি বাতিলের সিদ্ধান্ত, ঘৃণাভরে প্রত্যাখান আদিবাসী ফোরামের

 


জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) নবম ও দশম শ্রেণীর বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে ‘আদিবাসী’ শব্দযুক্ত গ্রাফিতি বাতিলের সিদ্ধান্তকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম।

বুধবার (১৫ জানুয়ারি) সংগঠনটির সহ-সাধারণ সম্পাদক ডা. গজেন্দ্র নাথ মাহাতো ও তথ্য প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হিরন মিত্র চাকমা স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানানো হয়।

কিছু সংখ্যক উগ্র সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর দাবির প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও কর্তৃপক্ষের সাথে কোনরূপ আলাপ না করে এনসিটিবি’র সিদ্ধান্ত গ্রহণকে দুঃখজনক বলে মনে করে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম। এমন হঠকারি সিদ্ধান্ত দেশের সাম্য, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় বড় অন্তরায়।

বিবৃতিতে আদিবাসী ফোরাম জানায়, গত ১২ জানুয়ারি স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি নামধারী একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী সংগঠনের কিছু সদস্য পাঠ্যপুস্তকের প্রচ্ছদ থেকে “আদিবাসী” শব্দ বাতিলের দাবিতে এনসিটিবির ভবন ঘেরাও করে এবং প্রশাসনের বাধা উপেক্ষা করে ভবনে প্রবেশ করেন। ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীদের মারমুখী অবস্থানের প্রেক্ষিতে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ কোন যাচাই-বাছাই না করে দাবি মেনে নেয় এবং ঐদিন রাতেই পাঠ্যপুস্তকের অনলাইন ভার্সন থেকে আদিবাসী শব্দ প্রত্যাহার করে নেয়।

জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বইয়ের নবম ও দশম শ্রেণির বাংলা ২য় পত্রের প্রচ্ছদ থেকে “আদিবাসী” শব্দ সম্বলিত গ্রাফিতি মুছে ফেলার মধ্য দিয়ে আদিবাসীদের আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয়কে আরেকবার অপমানিত করা হল বলে মনে করে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম।

এনসিটিবি’র সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি রোববার সন্ধ্যায় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিলে সংহতি জানিয়েছে সংগঠনটি।

© all rights reserved - Janajatir Kantho