মানুষের ভালবাসাই আমার পুরস্কার : যাদু রিছিল

image

প্রকাশ: ২০১৯/০৭/২১ ০৪:১৩

মান্দিদের জনপ্রিয় গীতিকার, সুরকার ও সংগীত শিল্পী যাদু রিছিল। যিনি বাঙালি সমাজে চাষার পোলা নামেই পরিচিত। মাসুদ পথিকের লেখা চাষার পোলা শিরোনামের এ গানটা গেয়েই তিনি অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেছেন। বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর শালবনের ইদিলপুর গ্রামে। শালবনের দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা হাহাকার বেদনার সাথে অতি পরিচিত সে। তা-ই শালবনের কথা নিয়ে গান বাধেঁন। গানে তুলে ধরেন শালবনবাসীর মানুষের আর্তনাদের কথা।

রাজধানীর কালাচাঁদপুর বোরাং কফি হাউসে’র এক আড্ডায় ব্যক্তিগত বিষয় ছাপিয়ে সংস্কৃতির অবক্ষয়, সমস্যা-সম্ভাবনা বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা হল বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় এই তারকা শিল্পীর সাথে। অকপটে জানালেন সেসব কথা। তারকা এই শিল্পীর সাথে একান্তে কথা বলেছেন উন্নয়ন ডি. শিরা

জনজাতির কন্ঠ: নিজেু গানের জগতে জড়ালেন কীভাবে?

যাদু রিছিল: ছোট কাল থেকেই গানের ভুবনে বেড়ে উঠা। পরিবার ছিল গানের এক জগত। বাবা মা ‍দুজনেই বাংলাদেশ বেতারে মান্দিদের জন্য নির্ধারিত প্রোগ্রাম সালগিত্তালের নিয়মিত শিল্পী ছিলেন। মান্দিদের এভার গ্রীন দুটি গান দিং দিং আপফাদে দিং দিং ও হাই সারি রি. নামা এ দুটি গানের শিল্পী মা মিতা রিছিল ও বাবা বিজন ঘাগ্রা।

জনজাতি: পারিবারিক আলাপের জেরে আরেকটি কথা বলা যেতে পারে যা অনেকেই হয়তো জানে না যে, আপনি মান্দি লিজেন্ড জন থুসিনের নাতি। জন থুসিন সম্পর্কে যদি কিছু বলেন..

যাদু: হ্যাঁ। জন থুসিন সম্পর্কে আমার নানু। তিনি যখন লেখালেখি করতেন তখন সেটির গুরুত্ব বুঝতাম না। তিনি যে মান্দিদের জন্য কত বড় সম্পদ ছিলেন সেটি সঠিক সময়ে আমরা বুঝতে পারিনি। যদি তার গুরত্ব বুঝতে পারতাম তাহলে হয়তো মান্দিদের আজ নিজস্ব বর্ণমালা থাকতো। দিং দিং আপফাদে দিং দিং, হাই সারি রিনামার মতো আরো জনপ্রিয় মান্দি গান পেতো।

জনজাতি: আপনি মূলত গিটার, উকুলেলে বাজান। গিটার বাজানো শিখলেন কার কাছ থেকে?

যাদু: কাচিঝুঁলি হোস্টেলে অনুতোষ ম্রং-এর কাছ থেকে গিটার বাজানো শিখেছি।

জনজাতি: এ যাবৎ কতটি গানে সুর, কন্ঠ দিয়েছেন?

যাদু: অনেকে গুলো গানেই তো সুর-কন্ঠ দিয়েছি। এরমধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য- ফাহমিদা নবীর মোট সাতটি গানের (সুর ও সংগীত), সামিনা চৌধুরী ২টি গান (সুর ও সংগীত), নচিকেতা ১টি (সুর ও সংগীত), বাপ্পা মজুমদার ১টি (সুর ও সংগীত), তাহসানের ট্রাফিক সিগন্যাল (সুর), এসআই টুটুলের পাগলের মেয়ে (সুর ও সংগীত), ফেরদৌস ওয়াহিদের মন শহর, মাসুদ পথিকের লেখা কুঁড়ে ঘর (সুর ও সংগীত), প্রান্ত পলাশের লেখা শৈশব (সুর ও সংগীত), কি করে বলি (কথা, সুর ও কন্ঠ নিজের), হয়তো কিছুই না (কথা, সুর ও সংগীত নিজের), শামীম পারভেজের লেখা বন বালিকা (সুর ও সংগীত), বাবুল ডি. নকরেকের লেখা ভার্জিনিয়া (সুর ও সংগীত), চাসং দ্রং-র লেখা মাইখো চানচিয়া (কন্ঠ) ইত্যাদি। যা এই মুহূর্তে মনে আসছে না।

জনজাতি: এরমধ্যে কোন গান গান গুলো শ্রোতাপ্রিয়?

যাদু: চাষার পোলা, বন বালিকা, হয়তো কিছুই না, শৈশব, মাইখো চানচিয়া।

জানজাতি: অল্প সময়ের মধ্যে অনেক গুলো কাজই তো করলেন। পুরস্কারের থলিতে কতটি পুরস্কার জমা হল?

যাদু: একটিও পুরস্কারও জমা হয়নি (হেসে)। তবে একটু পরেই সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন, মানুষের ভালবাসাই আমার বড় পুরস্কার।

জনজাতি: মান্দি কমিউনিটির একজন হিসেবে মান্দি গান বা মান্দি সংস্কৃতি নিয়ে আপনার কী ভাবনা?

যাদু: মান্দি সংস্কৃতি বিশাল এক জগত। বিশাল এই জগতে অনেক কিছুই করার আছে। অনেক কিছুই করার ইচ্ছেও আছে; ইচ্ছের তাড়না থেকেই মাইখো চানচিয়া ও ওয়ানগালা স্পেশাল-২০১৮ দুটি মান্দি অ্যালবাম এর মোট ১২টি গানের সংগীত পরিচালনা করেছি। যেটি মান্দি সংস্কৃতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে বলে আমি মনে করি।

জনজাতি: একটি কানকথা প্রচলিত আছে, আপনি সচরাচর স্টেজ পারফর্ম করেন না। এড়িয়ে যান..

যাদু: কথাটি অসত্য।

জনজাতি: আপনার ভাল লাগার স্টেজ পারফর্ম?

যাদু:  আগারগাঁও অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘চ্যারিটি শো ফর নিশান চাকমা’।

জনজাতি: ভবিষৎ কাজের কী পরিকল্পনা ?

যাদু: কোন পরিকল্পনা নাই। শুধু কাজ করে যেতে চাই।

জনজাতি: এখন কী কী কাজ করছেন?

যাদু: সাংস্কৃতিক সংগঠন খ্রেংনা ও ময়মনসিংহ কারিতাসের উদ্যোগে মান্দি মৌলিক গানের অ্যালবামের কাজ চলছে। অ্যালবামটি চলতি বছরের ওয়ানগালায় বের হবে। এছাড়াও মৃত্তিকার নতুন মান্দি সুরকার, গীতিকার মান্দি গান তৈরীর জন্য প্রতি মাসে একটি করে প্রোগ্রাম করার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছি।

এছাড়াও আগামী বছর (২০২০) বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকীতে তৌহিদ ইথুনের লেখা তুমিই বাংলাদেশ শিরোনামের গানে সুর দিয়েছি, যা একশোটি ভাষায় গাওয়া হবে। গানটিতে বিশ্বের ৭০টি দেশের খ্যাতনামা শিল্পীরা কন্ঠ দিবেন।

জানজাতি: সম্প্রতি মান্দিদের নতুন গানের দল ব্রিং-এ যোগ দিলেন। ব্রিং কী ধরনের গান করতে চায়?

যাদু: ব্রিং মূলত মান্দিদের লোক কাহিনি, ইতিহাস, আচার-অনুষ্ঠান, প্রথা, ইত্যাদি গুলো গানে তুলে আনতে চায়। যেমন- বুগা রাণী, আনাল-গোনালের কাহিনী, মান্দিদের শালিস, ঘুম পাড়ানি ইত্যাদি গুলো গানে ফুটিয়ে তুলতে চায়।

জনজাতি: নতুন কোন গান আসছে কিনা?

যাদু: হ্যাঁ। বিদ্যাবিলের মেয়ে।

জনজাতি: সেলিব্রিটিদের পেছনে অনেক ভোমরা ঘুরঘুর করে। এর ব্যতয় আপনার বেলাও নিশ্চয় ঘটেনি?

যাদু: (মুচকি হেসে) হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই। তবে আমি নিজেকে কখনোই সেলিব্রেটি মনে করিনা।

জনজাতি: ইদানিং মান্দিদের মধ্যে অনেক তরুণ গানের জগতে আসছেন। সেটি কীভাবে দেখছেন?

যাদু: এটি খুবই ইতিবাচক একটি দিক। জেনেটিক্যালি মান্দি ছেলে মেয়েদের মধ্যে সংগীতের ছোঁয়া আছে। আচার-আচরন, উৎসব পার্বণে সর্বত্র মান্দি সংগীতের ব্যবহার দেখা যায়। এদিক থেকে মান্দি ছেলেমেয়েরা অন্যান্য পেশার চেয়ে গানে ভাল কিছু করতেই পারে।

জনজাতি: তরুণ শিল্পীদের জন্য তিনিটি পরামর্শ..

যাদু: একটাই পরামর্শ। সেটি হল, লক্ষ্যে স্থির থেকে কাজ করে যাও।

জনজাতি: আপনার মূল্যবান সময় প্রদানের জন্য ধন্যবাদ।

যাদু: আপনাকেও ধন্যবাদ।

শেয়ার করুন

কমেন্টবক্স

আপনিও স্ব মতামত দিন