মুনের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধাচরণের গল্প

image
আপসানের উদ্যোক্ত মুন নকরেক সিলক্রিং। ছবি : ফেইসবুক।

প্রকাশ: ২০২১/০৩/২০ ০৩:২৬

কোন এক পহেলা  বৈশাখে দকমান্দা পড়ে ঘুরতে বের হয়ে বন্ধুদের কাছে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হয়েছিলেন এক গারো নারী শিক্ষার্থী। অন্তত পহেলা বৈশাখে শাড়ি না পড়ে কেন এসব আজেবাজে ড্রেস পড়া, এমন ছিল বন্ধুদের ফোঁড়া মন্তব্য। এই ঘটনা গারো মেয়ের মনে গভীর দাগ কাটে। এই ঘটনার প্রতিবাদে সেই মেয়ে আজ অব্দি একটি শাড়িও পড়েনি বরং কাজ করা শুরু করেন দকমান্দা নিয়ে।

গল্পটা মুন নকরেক সিলক্রিংয়ের। তিনি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্বদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০১০-১১ সেশনের শিক্ষার্থী। বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার শালবন পরিবেষ্টিত মধুপুরে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে এগোচ্ছিলেন চাকরির দিকে; কিন্তু এগিয়ে গিয়ে দেখলেন চাকরির বাজারের তুমুল প্রতিযোগিতায় স্থায়ী অবস্থান নেয়া দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। এতো সময় তাঁর হাতে একদম নেই। ফলে নকরেক আইটি নামের এক আইটি প্রতিষ্ঠান থেকে ট্রেনিং নিয়ে অনলাইনে আপসান নামের গ্রুপ খুলে শুরু করেন ব্যবসা। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে আপসান যাত্রারম্ভ করে।

গারো নারী উদ্যোক্তা মুনের লক্ষ্য ছিল চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখা। পাশাপাশি নিজেদের সংস্কৃতির উপর বৃহৎ জনগোষ্ঠীর যে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সেটির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া। লোহা দিয়েই লোহা অনুরূপ সংস্কৃতি দিয়েই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখতে হয়, এটি মুন ভালো করেই জানেন।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে মুন গারো সম্প্রদায়ের মাঝে নিজেদের পরিধেয় দকমান্দা, দকশাড়ি, খুতুপ, রিকমাচু, রিব্বক, দামা, ফং ইত্যাদি ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছেন। নিজের সংস্কৃতিকে অন্য সম্প্রদায়ের কাছে পরিচিত করাচ্ছেন। আর এটি করছেন আনন্দের সাথে।

শুরুর দিককার কথা জানাতে গিয়ে বললেন, সেই সময় কাজ করতে দিয়ে মধুপুরে এক গারো নারী ধর্ষণের শিকার হন। তখন নির্যাতিতার পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করেছি। কাজ করতে গিয়ে মনে হল, সাহায্যের জন্য বাইরের প্রতিষ্ঠানের দিকে না ছুটে আমাদের নিজেদের মেয়েদের নিয়ে কাজ করা উচিত। সেই থেকে নিজেদের মেয়েদের নিয়ে কাজ শুরু করি। এখন আমার আমানি জুমাং তাঁত প্রতিষ্ঠানে নিজেদের মেয়েরাই কাজ করছেন।

কথার সূত্র ধরে জানা গেল, আপসানের মডেল হিসেবে তিনি একান্তই গারো মডেলদের পছন্দ করেন। মনে করেন, আপসান যেহেতু গারোদের প্রতিষ্ঠান সেহেতু মডেল হবে সব গারো; এতে দকমান্দায় গারো নারীদের দেখতে কত সুন্দর লাগে সেটি বোঝা যাবে। দকমান্দার পরিচিতিও বাড়বে।

যে সকল গারো তরুণ-তরুণী পাশ্চাত্য কিংবা বাঙালি পোশাকের দাপটে নিজেদের পোশাক-অলঙ্কারকে দূরে ঠেলে রেখেছে তাদেরকে নিজের কাজ দিয়ে আকৃষ্ট করতে চান এই উদ্যোক্তা। তাঁর মতে, পুরোপুরি না হলেও কিছুটা হলেও এই জেনারেশনের গারো তরুণ তরুণীরা এতে আকর্ষিত হচ্ছেন, নিজের শেকড়ের সাথে তাদের পরিচয় ঘটছে।

ইদানিং অনলাইনে চোখ রাখলেই বেশ নতুন গারো উদ্যোক্তাদের কাজ দেখা যায়। এই উদ্যোক্তাদের নিয়ে তিনি তৈরী করেছেন আরেকটি ফেইসবুক গ্রুপ মাতগ্রিক (মান্দি উদ্যোক্তা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মিলন মেলা)। এখানে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং নিজেদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই উদ্যোগ।

দিনদিন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠা আপসানকে নিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন আবিমার মেয়ে মুন। ভবিষ্যতে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরের দেশগুলোতে নিজের কাজকে নিয়ে যেতে চান। সেক্ষেত্রে তিনি আবার গুরুত্ব দিতে চান নিজের জনগোষ্ঠীকে এবং ক্রেতা হিসেবেও চান গারো জনগোষ্ঠীকে।

বিশ্বায়নের এই সংমিশ্রনের সময়ে সেইসব সংস্কৃতি টিকছে যা বৃহৎ সংস্কৃতির বিপরীতে নিজেদের  স্বকীয়তা বজায় রাখতে পাচ্ছে। আদিবাসী উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীদের টিকে থাকতে হলে নিজেদের সিগনেচার প্রোডাক্ট নিয়েই টিকে থাকতে হবে বলে মনে করেন আপসানের কর্ণধার।

আপসান টিকে থাকুক। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠুক।

শেয়ার করুন

কমেন্টবক্স

আপনিও স্ব মতামত দিন