ব্যবহারের নিরিখে দেখা মারমা ভাষা

image
—লেখক

প্রকাশ: ২০১৯/০৫/১৭ ০৩:২০

বান্দরবান পার্বত্য জেলা শহরে আছি, প্রায় সপ্তাহ খানেক হয়ে গেল। অত্যুক্তি হবে না যদি বলি বান্দরবান মারমাদের শহর, কেননা এখানে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের তুলনায় মারমারা সংখ্যাধিক্য। কেবল পরিসংখ্যানের জোরে বান্দরবানকে মারমাদের শহর বলাটা সুধাসদনে কতটুকু গ্রহনীয় তা বিবেচ্য, তবে বান্দরবানকে মারমাদের শহর বলতেই আমার ইচ্ছে করে। সংখ্যাধিক্যের বলে এখানে মারমা ভাষার দাপট অসামান্য। এখানকার অন্যান্য আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীসহ খোদ বাঙালিও মারমা ভাষা জানেন, জেনে নিয়েছেন নিত্য প্রয়োজনের তাগিদে। বিশেষত বাঙালি ব্যবসায়ীরা অবশ্য মারমা ভাষা জানেন, বলতে না পারলেও অন্তত বুঝতে পারেন।

চেহারার দিক বিবেচনায় মারমা’রা আমাকে ধরেই নেয় আমি তাঁদের জ্ঞাতি ভাই, ফলে প্রায়শই মারমা ভাষায় আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় আর আমি ‘থ’ বনে থাকি, স্বভাব সুলভ মুচকি হাসি হেসে না বোধক মাথা নাড়ি, নত মস্তকে অপারগতা স্বীকার করি, লজ্জিত হই। লজ্জাস্কর পরিস্থিতি এড়াতে আমিও বাধ্য হয়ে ইতোমধ্যেই বেশ কিছু মারমা ভাষা রপ্ত করে ফেলেছি, আত্বরক্ষার্থে। যেমন- হ্রিখোবায়া (আদাব/নমস্কার), কোদ মযং হিবালেঃ (আপনি কেমন আছেন?), প্রতুত্তরে বলতে হয় ঙা কোগং হিরে (আমি ভাল আছি)। ভাষা বাক্য হলেও মারমাদের মতো হুবুহু গারোর সুর হয় না, সুরে ধরা খেয়ে যাই। মারমা ভাষায় লোকাল চট্টগ্রামের ভাষার প্রবল টান আছে, চট্টগ্রামের লোকাল ভাষা জানা থাকলে হয়তো কোন রকমে চালিয়ে নিতে পারতাম। মান মরে কোন রকম বেঁচে ফিরি।

ভাষার বাঁচা মরা নির্ভর করে ব্যবহারকারীর উপর। ভাষা বাঁচবে না মরবে কিংবা সমৃদ্ধ হবে কি হবে না তা পুরোপুরি নির্ভরশীল ব্যবহারকারীর উপর। ভাষা তখনি শহীদ হবে যখন ঐ ভাষাভাষীর মানুষ তাঁদের ভাষাকে অবজ্ঞা করবে, নিত্য ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে। ভাষার মৃত্য দু’ভাবে ঘটতে পারে- এক, ভাষা ব্যবহারকারীর না থাকা এবং ব্যবহারকারী থাকা সত্ত্বেও ব্যবহার না হওয়া। দ্বিতীয় কারনটির জন্যে পৃথিবীর অনেক জাতিগোষ্ঠীর ভাষা আজ বিলীন, সমাধিস্থ। বাংলাদেশের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষাও কাফনের কাফন জড়িয়ে সমাধিস্থ হওয়ার নিস্করুন অপেক্ষায়।

বাংলাদেশে বাঙালির মাতৃভাষা বাংলা ছাড়াও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষা আছে। চাকমা, মারমা, গারো, ত্রিপুরা, সাওতাঁল, কোচ, হাজং, খুমি, রাখাইন, চাক, মনিপুরী, খাসিয়া ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষা আছে। দেশে বাংলা ভাষার পরেই কথ্য ভাষা হিসেবে সাওতাঁল ভাষার অবস্থান দ্বিতীয়ে, দ্বিতীয় হলেও সাওতাঁল ভাষার অবস্থা ভাল মানে নেই। এখানে গবেষক নাসিমা পলির ভাষার ক্রম বিলুপ্তি ধারার সাধারন তত্ত্ব তুলে তুলনামূলক আলোচন তুলে ধরা যেতে পারে। পলির তত্ত্বানুযায়ী (নিরাপদ>বিপদগ্রস্থ>বিপন্ন>গুরতরভাবে বিপন্ন>বিলুপ্ত) বাংলা ভিন্ন দেশের কোন ভাষার অবস্থা-ই নিরাপদ অবস্থানে নেই। দেখা যায়, ভাষা গুলোর কোন কোনোটির অবস্থা বিপদগ্রস্থ, বিপন্ন, গুরুতরভাবে বিপন্ন আবার কোন কোনোটি প্রায় বিলুপ্তির পথে ধাবমান। ভাষার চর্চা, বিকাশের লক্ষ্যে যদি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, পর্যাপ্ত পরিমানে আর্থিক-কারিগরী সহযোগিতা না থাকে তবে ভাষা গুলোর এমন দুরূহ অবস্থা হবে এতো স্বাভাবিক জলের ব্যাপার। ভাষা হারিয়ে যায়, হারানোর পথে ক্রমাগত ধাবিত হয় তবু রাষ্ট্র মৌন কেন?

বিপদাপন্নের মাঝেও মারমা ভাষা নিয়ে আমি চরম আশাবাদী। মারমাদের মাঝে কয়েকটি বিষয় ঈগল চোখে প্রত্যক্ষ করেছি, একজন মারমা আরেকজন মারমার সাথে কখনোই মারমা ভাষা ছাড়া অন্য দ্বিতীয় কোন ভাষায় ভাব বিনিময় করেন না। বরং অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠী যেমন, বম, খুমি, ত্রিপুরা, চাকদের সাথে স্বাভাবিক কথোপকথনেও মারমা ভাষায় কথা বলেন। মারমা জানা বাঙালির সাথে মারমারা নিজের ভাষাতে বাক্য বিনিময় করেন।

মারমা ভাষার প্রায়োগিক দিক দেখলে আরো আশাবাদী হওয়া যায়, ঘর বাহির সর্বত্র মারমা ভাষার রমরম ব্যবহার। একজন মারমা ঘরে সবসময় মারমা ভাষায় কথা বলেন। প্রেমিক প্রেমিকার সাথে ভালবাসা নিবেদন করেন মারমা ভাষায়। শুধু তাই নয় সন্তানের নাম রাখা, বিয়ের কার্ড, সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সালিশ-বৈঠক, তোরণ, গান, মাইকিং, পোস্টারিং ইত্যাদির মতোন সব কাজে মারমা ভাষা ব্যবহার করা হয়। বান্দরবান শহরে আমিও মারমা ভাষায় মাইকিং শুনেছি, দেখেছি মারমা ভাষায় লেখা বিয়ের কার্ড, স্থাপিত তোরণ। প্রার্থনালয়ে ভান্তেদের সাথে সংলাপ সংযোগে সর্বদা ব্যবহৃত হয় মারমা ভাষা। তবে পালিও ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

ইদানিংকালে যুগের আবেদন ধরে মারমারা নিজের মাতৃভাষার অক্ষর সংবলিত টাইপিং সফটওয়্যার তৈরী করে ফেলেছে, ফলে মারমা ভাষায় টাইপিং এর কাজটাও হয়ে গেছে সহজ। তবে প্রসঙ্গ ফেরে একটি যাচিত বিষয়ে কথা বলা যেতে পারে, সহজভাবে বোঝার স্বার্থে অনেকেই বাংলা হরপে মারমা ভাষা লিখছেন, কিন্তু দেখা যায় বাংলা ভাষা মারমা ভাষার উচ্চারন-ধ্বনি ধরতে পারে না, এমনটাই জানিয়েছেন বান্দরবান নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউটের গবেষণা কর্মকর্তা উ চ নু। তিনি নিজেও মারমা সম্প্রদায়ের একজন, ফকফকা কাগজে নিজের নাম পৃথকভাবে মারমা ও বাংলা হরপে লিখে উচ্চারন করে শোনালেন, দেখা গেল মারমা শব্দকে বাংলা শব্দচ্চারন ঠিক মতোন ধরতে পারে না। ধ্বনি উচ্চারনগত সমস্যা থেকেই যায়।

নানান সমস্যা মালা, প্রতিবন্ধকতার মাঝেও বলতে ইচ্ছে করে বাংলা নয়, মাতৃভাষা মারমাতেই ভাব বিনিময়, লেখালেখি, অনুবাদ, নতুন নতুন গান, ভিডিও তৈরী হোক। নিজের ভাষা সংস্কৃতি ঐতিহ্য রক্ষার শপথ, দৃঢ় মানসিকতা একদিন আমাদের পৌঁছে দিবে কাঙ্ক্ষিত ইপ্সিত লক্ষ্যে। একদিন আমাদেরও জয় হবে, আদিবাসী মেহনতী নিচু তলার মানুষের জয়, আমরা করবো জয়! জয়ের দিন সন্নিকট। আম্যা মউই (বেশি দূরে নয়)!

শেয়ার করুন

কমেন্টবক্স

আপনিও স্ব মতামত দিন