মামা, বন্যপ্রাণী আইন ও অমীমাংসীত পাহাড়ি যন্ত্রণা

image
—লেখক

প্রকাশ: ২০১৯/০৬/০৪ ০২:৪২

জ্ঞাতি সর্ম্পক সূত্রে মামা বললে মায়ের আপন ভাইকে আমরা বুঝে থাকি, বুঝে নিই। তবে মামা শব্দের চল এতো চলে যে, বন্ধু, যান চালক, কন্ডাক্টর, দোকানি অনুরূপ কাউকে সম্বোধনের সময় আমরা মামা শব্দটার গয়রহ প্রয়োগ করে ফেলি। প্রয়োগ বিশেষে মামা অতি আপন, জানের জীগার শব্দের সমার্থক, কোন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত একটি শব্দ। চলতি লেখায় এমন এক মামার কথা তুলে ধরতে চাই যা জ্ঞাতি সর্ম্পকে তো নয়-ই বরং দু’পেয়ে সম সর্ম্পকীয় প্রাণীও নয়। এই সর্ম্পক প্রকৃতি-প্রকৃতিবাসীর সাথে মানুষের প্রকৃত সম্পর্ককে উর্ধ্বে তুলে ধরে। আঙুল নির্দেশে দেখিয়ে দেয় সৃষ্টির সুন্দরতম রূপ।

আমি গারো পাহাড় পাদদেশের লোক। এই পাহাড়ের অপার রূপ, পাহাড়ি মানুষের আনন্দ, দুঃখ, জ্বালা দেখে বেড়ে উঠেছি। গোটা দেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়কে দুর্বার গতিতে হাঁটে, তখন আমার গারো পাহাড়বাসী পুরনো জ্বালা পুষে ধুকে ধুকে বেঁচে থাকে। মরে অমীমাংসীত পাহাড়ি যন্ত্রণায়। মা হারায় সন্তান, স্ত্রী হারায় স্বামী, দরিদ্র কৃষক হারায় কষ্টের সারা বছরের ফসলি খোরাক। খেয়ে না খেয়ে মনে করে অমীমাংসীত এই যন্ত্রণা লাঘবে তাঁদের পাশে বিশেষ কেউ নেই!

গারো পাহাড়ের ভারত সীমা ঘেঁষা বকশীগঞ্জ, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী, হালুয়াঘাট উপজেলা অঞ্চলে মূলত নিসর্গ প্রেমী প্রকৃতির সন্তান গারো, কোচ, হাজং, ডালু, বর্মণ আদিবাসী মানুষের বসবাস। এক সময় এই অঞ্চল গুলোতে আদিবাসী সংখ্যার মতোই বিশাল অরণ্য ছিল। নিভৃত অরণ্যে আবৃত ছিল গারো পাহাড়। যা বর্তমানে আর নেই। অবশিষ্টাংশ আছে স্বারক চিহ্ন হয়ে। যার ফলে প্রকৃতি ও প্রকৃতিবাসী উভয়ই পড়েছে জীবন অস্তিত্বের মহা সংকটে। সংকটটা বেড়িয়ে পড়েছে ফুস করে পেট কেটে বেড়িয়ে পড়া ভুরির মতো।

তো অত্রাঞ্চলের বনবাসী পাহাড়ি মানুষ (আদিবাসী বাঙালি নির্বিশেষ) মামাদের উৎপাত-যন্ত্রণায় ভোগেন। মামা বলতে হাতি। এখানকার মানুষ হাতিকে হাতি বলে ডাকেন না! ডাকলেও ডাকেন হাতি মামা বলে। বড় কাউকে সম্মান দেখিয়ে কথা বলা এদেশের পুরনো রীতি, সম্ভবত হাতি বৃহদাকার বলে সম্মান করে নাম না ভাঙিয়ে ডাকেন মামা বলে। তাছাড়া বিশ্বাস, হাতি বললে হাতি রুষ্ট হবেন, তিনি দূরে থেকেও মস্ত বড় কানের সাহায্যে সব কথ্য-অকথ্য শুনতে পান। তা-ই তাঁর নাম ধরে ডাকা যাবে না। যাবে না বলেই ডাকেন মামা বলে। অনেকে বাবু বলেও সম্বোধন করেন। অতি আদরের নাম।

মামা কিংবা বাবু যে নামেই ডাকুন, সাম্প্রতিকালে এই মামা বাবুদের যন্ত্রণা-উৎপাতে ফের নাকাল এই অঞ্চলের জনসাধারন। প্রায়শ বুনো মামার পাল লোকালয়ে ফসলি ক্ষেতে হামলা চালিয়ে নষ্ট, খিদার চোটে সাবার করে দিচ্ছে বাগানের লিচু, কলা, আলু ইত্যাদি কৃষি ফলজ। এক ধরনের ফসল ডাকাতি। শেষ এখানেই নয়, ঘরবাড়িতে হানা দিয়ে গোলা ঘরের ধান লুটে নিচ্ছে। এভাবে মানুষের পেটের দানার ভাগ যদি মামাদের বিশাল পেটে গিয়ে পড়ে তবে এখানকার খেটে খাওয়া মানুষ এক মরসুম শেষ হতে না হতেই অন্নহীন হয়ে পড়বে এ আশঙ্কা প্রকাশ সত্য হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

হাতি মানুষের এই যে রূঢ় বাস্তব পরিস্থিতির দায় কার? দায় তো আছে কারো না কারো। দায়হীন ঘটনা ঘটতে পারে না। একসময় তো এমন পরিস্থিতি ছিল না। বনে মানুষ হাতি বসবাস করতো যে যার মতোন স্বাচ্ছন্দ্যে, অতি আনন্দে। হাতিদের সম্মান করে বনবাসী ডাকতো মামা বলে, এই ডাক এখনো রয়ে গেছে কিন্তু হারিয়ে গেছে একসাথে বসবাস করার মিলমিশ-সম্প্রীতি। এখন হাতি মানুষে দ্বন্ধ-যুদ্ধ নিয়ত। বিশাল পেটের খিদার চোটে হাতি মানুষের খাবারে জোর ভাগ বসাতে চায় অন্যদিকে মানুষ রুখে দাঁড়ায়, ফলে যুদ্ধ বাঁধে প্রতিনিয়ত। হাতি-মানুষের এই যুদ্ধে উভয়ই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হন, কখনো সখনো প্রাণও হারান। কখনো হাতি, কখনো মানুষ।

হাতি মামার আক্রমনে ভাগিনা’রা ক্ষতিগ্রস্থ, প্রাণ হারান, এ খবর প্রায়শ শোনা যায়। কিন্তু কদাচিৎ হলেও শোনা যায় না ভাগিনার আক্রমনে মামা নিহত। ভাগিনা জীবনের হাজার শঙ্কা-উৎকন্ঠার মাঝেও মামা’র ক্ষতিসাধন করতে পারে না আইনের বলে। আইন বেঁধে রাখে ভাগিনার হাত। দেশের চলতি বন্য প্রাণী আইন ভাগিনার বেলায় খাটলেও মামা’র বেলায় পুরোপুরি অপ্রযোজ্য। আঠারো মাইনাস!

বন্যপ্রাণী (সংরক্ষন ও নিরাপত্তা) আইনে মামা’দের নিরাপত্তার বিধান দেয়া হয়েছে। এই আইনের কাছে ভাগিনারা অসহায়। এই বিধান যদি কেউ অমান্য, লঙ্ঘন করে তবে কপালে শাস্তি নিশ্চিত। যেমন বন্যপ্রাণী আইনের নবম অধ্যায়ের অপরাধ ও দন্ড বিধানে বলা হচ্ছে-

‘বাঘ ও হাতি হত্যা, ইত্যাদির দন্ড (১) কোন ব্যক্তি ধারা ২৪ এর অধীন লাইসেন্স গ্রহণ না করিয়া তফসিল-১ এ উল্লিখিত কোন বাঘ বা হাতি হত্যা করিলে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন ও উক্তরূপ অপরাধের জন্য জামিন অযোগ্য হইবেন এবং তিনি সর্বনিম্ন ২ (দুই) বৎসর এবং সর্বোচ্চ ৭ (সাত) বৎসর পর্যন্ত কারাদন্ড এবং সর্বনিম্ন ১ (এক) লক্ষ এবং সর্বোচ্চ ১০ (দশ) লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত হইবেন এবং একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটাইলে সর্বোচ্চ ১২ (বার) বৎসর পর্যন্ত কারাদন্ড এবং সর্বোচ্চ ১৫ (পনের) লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত হইবেন।’ [বন্যপ্রাণী (সংরক্ষন ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২]

কাজেই বুনো মামা বনবাসী, বনবাসীর উৎপাদিত ফসলের হাজারো ক্ষতি সাধন করলেও মামা’র ক্ষতিসাধনের কথা প্রশ্নাতীত। এ যেন রাষ্ট্র প্রকৃতির অমোঘ বিধান। মামা’র জনম যন্ত্রণা ভাগিনাকে সহ্য রয়ে সয়ে যেতে হবে নীরবে। হাতির ক্ষতিসাধনের ব্যপারে আইন ‍চললেও হাতি দ্বারা যদি কেউ আক্রান্ত হন তবে আইন নীরব। অচল। ঐ আইনের একই ধারায় বলা হচ্ছে- ‘তবে শর্ত থাকে যে, বাঘ বা হাতি কর্তৃক কোন ব্যক্তি আক্রান্ত হইলে এবং উহার ফলে তাহার জীবনাশঙ্কার সৃষ্টি হইলে জীবন রক্ষার্থে উক্ত আক্রমণকারী বাঘ বা হাতিকে হত্যার ক্ষেত্রে এই ধারার বিধান প্রযোজ্য হইবে না।’

গারো পাহাড়জুড়ে বুনো মামাদের উৎপাত-যন্ত্রণা একসময় বর্তমানের মতোন ছিল না। পাহাড় কমে আসার সাথে সাথে কমে গিয়েছে খাদ্য, অন্যদিকে চক্রাকারে বেড়ে গিয়েছে মামার যন্ত্রণা, অসহনী উৎপাত। এখন হাতি মানুষে দ্বন্ধ-যুদ্ধ নিয়ত।

প্রকৃতিকে প্রকৃতির সাথে নিজেদের স্বার্থে যিনিরা দ্বন্ধ-সংঘাত, সংঘর্ষ-বিবাদ, পক্ষ-প্রতিপক্ষ বানিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে খাঁড়া করে দিয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে রব উঠবে কবে? প্রকৃতি প্রকৃত মানুষের এইতো মোক্ষম সময়।

তন্ময় হয়ে ভাবি, গারো পাহাড় পাদদেশের মরন যন্ত্রণা কি চিরকাল অমীমাংসীত থেকে যাবে?

শেয়ার করুন

কমেন্টবক্স

আপনিও স্ব মতামত দিন