গারো সংস্কৃতিতে ‘ওড়নার অনুপ্রবেশ’ ও কিছু প্রশ্নোত্তর

image
—লেখক

প্রকাশ: ২০২০/১১/২০ ০২:২৮

সম্প্রতি সাভারে গারো ছাত্রীর উপর ঘটে যাওয়া ঘটনায় ‘ওড়না’ ফের আলোচনায় এসেছে। আলোচনার অগ্নিগর্ভে ঘি ঢালার আগে ঘটনা যাদের কাছে এখনো অজানা তাদের জন্য বলি, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গারো ছাত্রী সাভার থেকে ক্যাম্পাসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ওড়নাহীন এমএম লাভলী বাসে উঠলে বাসে থাকা দুইজন লোক তাকে বাধাঁ দেন। প্রতিবাদ করলে এক পর্যায়ে তাদের সাথে প্রচন্ড বাকবিতণ্ডা হয়। বাসে থাকা লোকগুলো ধর্ষণের জন্য পোশাককে দায়ী করেন এবং ওই গারো ছাত্রীকে ময়লা আবর্জনা বলে বাস থেকে জোরপূর্বক নামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন।’ এটি জনজাতির কন্ঠ ‘সাভারে ওড়নাহীন বাসে উঠায় গারো ছাত্রীকে হয়রানি’ শিরোনামে খবর করে। এই খবরে গারো সমাজে মিশ্র মৌলবাদী কমেন্ট লক্ষ্য করা গেছে। যা গারোদের বৃহৎ আগ্রাসী সমাজের পুরষবাদী হুজুর মনস্তত্বকে উপস্থাপন করে।

সেইসব মৌলবাদী উগ্রপন্থী ‘গারো হুজুরদের’ উদ্দেশ্যে প্রথমেই যে কথাটি পরিস্কার করে বলা ভালো, ওড়না গারো নারীর পোশাকের নিজস্ব অনুষঙ্গ নয়। সেটেলার বাঙালিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে যেভাবে অনুপ্রবেশ করেছে তেমনি ওড়নাও গারো সংস্কৃতিতে অনুপ্রবেশকারী। কেবল গারো সংস্কৃতিতেই নয়, অন্যান্য আদিবাসী এমনকি প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিতেও ওড়না বা পাট্টা অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়। ইতিহাসের দিকে নজর দিলে বিষয়টি পরিস্কার হবে।

ঋগ্বেদের কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এবং দুই চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন (পঞ্চম দশক) ও হিউয়েন সাঙয়ের (সপ্তম দশক) ভ্রমণ বৃত্তান্তে প্রাচীন ভারতীয় নর-নারীর পরিধেয় পোশাক, বেশ-ভূষা সম্পর্কে জানা যায়। সেখানে নারীর পোশাকে কোথাও ওড়নার প্রসঙ্গ দেখা যায় না। বরং নারীর পোশাক সংক্রান্ত আলোচনায় বলা হচ্ছে, ‘নারীরা দড়ি বা কোমড় বেষ্টনী দিয়ে আটকানো বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের কটিবস্ত্র এবং অনেকে নিজেকে কাধ পর্যন্ত বস্ত্রাবৃত করতো। নারীর কেশ পরিচর্যার ধরণ ছিল শঙ্কুসদৃশ খোঁপা, সাধারণ খোঁপা, শিথিল অলকগুচ্ছ।’ আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব প্রথম/চতুর্থ শতকে রচিত মহাকবি কালিদাসের রচনাতেও উষ্ণ ও শীতল আবহাওয়ার উপযোগী পোশাকের কথা জানা যায় কিন্তু কোথাও নারীর ওড়নার কথা দেখা যায় না। তাহলে ভারতীয় নারীর পোশাকে ওড়নার সংযোজন ঘটলো কবে থেকে?

এই প্রশ্নের উত্তরে ঐতিহাসিকরা বলছেন, পনেরো শতকে উপমহাদেশে যখন মুসলিম প্রভাব বিশেষ করে মুগল সম্রাট মুহম্মদ জালালউদ্দিন আকবর (১৫২৬) দিল্লীর ক্ষমতা গ্রহণ করেন তখন ভারতীয় পোশাক, বিশেষ করে মেয়েদের পোশাকের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় পরিবর্তন সাধিত হয়। মঙ্গোলীয় নারীদের পরিধেয় পোশাক মণিমুক্তায় আচ্ছাদিত পাখাসদৃশ মুকুটের স্থান দখলে নেয় নেকাব বা দোপাট্টা। এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পোশাকের সংযোজন বিয়োজনের খেলায় ভারতীয় নারীর পোশাকে ওড়না পাকা আসন নিয়ে নেয়। যা উপমহাদেশে বসবাসরত আদিবাসী নারীর পোশাকে যাদুর গালিচার মতো এসে পড়ে। শুধু আদিবাসী সংস্কৃতিতেই নয়, বর্তমানে গোটা ভারতীয় সংস্কৃতিতে এইরকম বাইরের পোশাক-পরিচ্ছদ গেড়ে বসেছে। এটি কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।

গারোদের নিজস্ব পোশাক-পরিচ্ছদ, অলঙ্কার আছে। মেয়েদের নকমান্দা, দকসারি, রিপবক, রিচমাচু, নাদিলেং, নাতাপ্সি, জাক্সান, থাংকা সরা, দোমি, সাংগং; ছেলেদের খাড়া লেংটি, ধুতি, খুতুপ, গান্দো ইত্যাদি গারো সমৃদ্ধ সংস্কৃতির উপাদান। এই যে, পোশাকের এতগুলো তালিকা দিলাম এতে কোথাও তথাকথিত অনুপ্রবেশকারী ওড়নার নাম পাবেন না, ওড়নার গারো শব্দ কি? গারো ভাষায় ওড়নার প্রতিশব্দ জানা যায় না। একটি জনগোষ্ঠীর মাঝে যদি ওই শব্দ সংক্রান্ত কার্যকলাপ তৎপরতা নাই থাকে তবে সেই শব্দের বুৎপত্তি ঘটবে না। এটি সহজ স্বাভাবিক ব্যাকরণিক বিষয়। যেমন ধর্ষণ, সাইন্স, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট ইত্যাদির গারো পরিভাষা নেই। উল্লেখিত শব্দগুলোর প্রয়োজন বা ব্যবহার তৎসময়ের গারো সমাজে ছিল না। এখন বোঝার সুবিধার্থে গারোরা এই শব্দগুলোর ইংরেজী পরিভাষাই ব্যবহার করে। বিষয়টি আরও প্রামাণিকভাবে বলা যেতে পারে, দেশের ৩২টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর ৩৩টি ভাষায় ‘ধর্ষণ’ শব্দের কোন প্রতিশব্দ নেই। এইসব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনে ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য ঘটনা ছিল না বলেই এর প্রতিশব্দ তৈরী হয়নি। শব্দের উদ্ভব তখনি ঘটে যখন সমাজে সেই কাজের বা ঘটনা ঘটমান থাকে। আদতে অতি সভ্য আদিবাসী সমাজে ‘ওড়না’, ‘ধর্ষণ’ শব্দের প্রয়োজন ছিল না। কারণ পূর্বে এইসব ঘটনা আদিবাসী সমাজে কখনো ঘটে নাই।

বাংলাদেশের গারো নারীরা তাদের পরিধেয় বস্ত্রে ওড়না ব্যবহার করে। কিন্তু ভারতের গারোরা ওড়না ব্যবহার করে না, কেননা ‘ওড়না’ গারো কালচারে নেই। মেঘালয়ের গারো নারীরা দকমান্দা, দকশারির সাথে টপস পড়ে; উৎসবাদিতে রিকমাচু, রিব্বক অন্যান্য অলংকার গায়ে চড়ায় কিন্তু কোথাও কাউকে ওড়না নিতে দেখা যায় না, সে বয়োবৃদ্ধ হোক আর কিশোর-যুবতীই হোক, কেউ বুকে ওড়না নেয় না। কিন্তু বাংলাদেশী গারো নারীরা দকমান্দা টপস পড়ার সাথে সাথে বাড়তি ওড়না অনুষঙ্গ চাপায়। এখানে একশ্রেণীর খচ্চর কিছু গারোর খোড়া যুক্তি প্রণিধানযোগ্য, ‘যে দেশে যে বাউ উল্টা কইর‌্যা নৌকা বাউ’; তাদের উদ্দেশ্যে বলি ভাউ ‘তোমরা শেকড় সন্ধানী হও’ নয়তো স্রোতের তোড়ে ভাসতে ভাসতে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশবেন যেখানে দেখবেন আপনার নিজস্বতা বলে আর কিছু থাকছে না। সাভারের ঘটনা স্রেফ এক নারীর উপর ঘটে যাওয়া বিছিন্ন ঘটনা নয়, এটি গোটা গারো তথা আদিবাসী সংস্কৃতির উপর আঘাত। সাংস্কৃতিক নিপীড়নের অংশ। গারো হুজুরদের ‘যে দেশে যে বাউ’ বক্তব্য মেনে হালকা হলেও বিনয়ের সাথে যদি বলি, দেশীয় সংস্কৃতিতে বোরকা-হিজাব নিত্য অনুষঙ্গ ফ্যাশনে দাঁড়াচ্ছে সেখানে আপনার বউ, মেয়ে, মা, বোন কেন সেই অনুষঙ্গ থেকে বাদ যাচ্ছে?

ধর্ষণ কিংবা নারী নিপীড়নের জন্য পোশাককে যাঁরা দায়ী করেন তা যথার্থ নয়। ধর্ষণের জন্য পোশকই যদি দায়ী থাকতো তাহলে শিশু-কিশোরী-বৃদ্ধা কেন ধর্ষিত হয়? আদতে এই বয়সের নারীদের সাথে পোশাকের কোন সম্পর্ক থাকে না, তারপরও তাঁরা ধর্ষিত হন। অতীত আদিবাসী পোশাক মাত্রই ছোটখাটো, কিন্তু তবু আদিবাসী সমাজে ধর্ষণের প্রবণতা নেই। পাবর্ত্য চট্টগ্রামের গহীন অরণ্যে বসবাসরত ম্রো আদিবাসীরা এখনো আদিম পোশাক পরিধান করে, মেয়েদের বুক উন্মুক্ত, কই ম্রো সমাজে তো ধর্ষণ দেখা যায় না। কাজেই ধর্ষণের জন্য যাঁরা নারীর পোশাককে দায়ী করেন তাঁরা নারীকে ঘরবদ্ধ করে রাখার যে মৌলবাদী তৎপরতা চলমান তাঁরা সেই চক্রান্তের অংশী। এখানে গারো প্রতিক্রিয়াশীলরা মৌলবাদীদের সেই লড়াইকে এগিয়ে নিচ্ছেন মাত্র। জেনে না জেনে আপনিও সেই লড়াইয়ের অংশী নন তো?

আমাদের গারোদের মগজ অনেক আগেই অধিকৃত হয়ে গেছে সরকার, এনজিও, মৌলবাদী পুরুষতন্ত্রের কাছে। আমাদের মননজুড়ে এনজিও। এনজিও’রা যেভাবে আমাদের নার্সারী করেছে আমরা সেইভাবেই সামাজিক, সাংস্কৃতিক এমনকি রাজনৈতিক কার্যকলাপ গুলোও পরিচালনা করি। সব কাজের এক ধরণ। কোন জায়গাতেই ভিন্নতা নেই। সমাজের সমস্ত ক্ষেত্র এনজিওকরণের ফলে নিজস্ব চিন্তা, উদ্ভাবনী শক্তি, সৃজনশীলতা, নিজস্ব স্টাইল তৈরী হচ্ছে না। গারো সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি সবক্ষেত্রে নিজস্ব স্টাইল গড়ে তোলা দরকার। পরের জ্ঞানে পোদ্দারি আর কত?

শেয়ার করুন

কমেন্টবক্স

আপনিও স্ব মতামত দিন