খেলা হয়ে উঠে না আর মান্দি খেলা

image
—লেখক

প্রকাশ: ২০১৯/০৭/১৯ ২৩:৫৪

বাড়ির দক্ষিণ পাশে আমাদের এক বিরাট খেলার মাঠ ছিল। আমরা মাঠটার নাম দিয়েছিলাম ‘ধূলাবাড়ি’। যেমন নাম তেমন-ই কাম। একমাত্র বর্ষা সিজ্ন ছাড়া মাঠটা’তে সারা সময়েই থাকতো ধূলা আর ধূলা। শরৎ বাবুর ভাষায় যেটাকে বলা যেতে পারে ‘ধূলার সাগর’। ধূলাবাড়িতে আশেপাশের সারা গ্রামের ছেলেমেয়েরা এসে খেলতো। আগে গ্রামের ক্লাব গুলো ছিল বেশ সংগঠিত, বড়’রা ক্লাব গুলোর মাধ্যমে ফুটবল-ক্রিকেট খেলা ছাড়ত যেটাকে আমরা ফিকশ্চার বলেই জানি। দূর দূরান্ত থেকে লোকজন খেলতে; খেলা দেখতে আসতো। ফিকশ্চারের ফিক্সড্ খেলা চলাকালীন সময়ে আমরা ছোট’রা খেলার সুযোগ পেতাম কম। শুক্রবারে বিটিভি’তে বাংলা ছায়াছবি বা আলিফ লায়লা হওয়ার সময়ে খেলা লাইভ টেলিকাস্টে যেমন বিরক্ত হতাম, এই সময় গুলোতেও তেমনি হয়ে থাকতাম তিক্ত বিরক্ত। দিনে খেলতে না পারলেও আমরা রাতে খেলতাম, তবু মিটিয়ে নিতাম খেলার নিত্য চাহিদা। শরৎ হেমন্তের জোৎস্না জ্বলা রাতে আমরা দুরন্ত কিশোর-কিশোরীর দল ধূলাবাড়ি মাতিয়ে তুলতাম দেশীয় খেলায়; খেলতাম মান্দি খেলাও। মান্দি খেলা চা.আখক রিম্মা (চোর ধরা), রাজামা খাল্লা’র মতো খেলায় আমাদের বাঙালি বন্ধুরা’ও যোগ দিত। গভীর রাতে ফকফকা আলোয় জম্পেশ জমে উঠতো খেলা।

চা.আখক রিম্মা খেলা সম্পর্কে সবার-ই কমবেশ ধারণা থাকতে পারে। চোর পাকড়াও’য়ের এই খেলা শৈশবে প্রত্যেকেই খেলেছি। এখানে রাজামা খেলা সম্পর্কে কিছু কথা বলা যেতে পারে কেননা এই খেলার ধরন সম্পূর্ণ আলাদা।

এই খেলার জন্য আমরা একজন রাজামা (প্রধান) নির্বাচন করে দু’দলে ভাগ হয়ে যেতাম। রাজামা একটি নির্দিষ্ট আসনে উপবিষ্ট হয়ে নিরপেক্ষভাবে খেলা পরিচালনা করেন। দুই দলের যেকোন একটি দল মর্জি মতো খেলা আরম্ভ করতে পারে। কে আগে খেলবে কে পরে এ নিয়ে আমাদের মাঝে ছিল যথেষ্ঠ বনিবনা। খেলা শুরু হলে পর, রাজামা খেলা শুরুকারী দলনেতার দু’চোখ দু’হাত দিয়ে চেঁপে ধরে এবং ক্রমান্বয়ে দলের বাকি সদস্যরা ধরে একে অপরের চোখ, যাতে প্রতিপক্ষ দলের লোকজন কোথায় লুকাচ্ছে তা দেখতে না পায়। এই সময় প্রতিপক্ষের লোকজন নিকটবর্তী ঝোপঝাড়ে যে যার মতো নিজেকে লুকিয়ে ফেলে। রাজামা ‘কককেরেক’ বলে সংকেত ধ্বনি দেয়ার সাথে সাথেই অপর পক্ষের লুকিয়ে থাকা খেলোয়ারদের খুঁজে বের করার জন্য সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়ে যায়। লুকিয়ে থাকা কাউকে দেখলে সে তাঁকে ধরার জন্য দাবড়াবে এবং ধরতে পারলে ধৃত খেলোয়ার হবে ঐ ইনিংসের জন্য মৃত। আবার লুকিয়ে থাকা কেউ যদি পালিয়ে এসে রাজামা’র মাথা স্পর্শ করে তবে স্পর্শকারীর দল হয়ে যায় বিজয়ী। এভাবে দলবেঁধে গভীর রাত অব্দি আমরা রাজামা খেলা খেলতাম।

তবে এখন দেখি এই খেলাতেও রাজামা’র ডাকে পরিবর্তন এসেছে, পূর্বেকার ‘কককেরেক’ ধ্বনির বদলে সে গেঁয়ো ভাষায় ডাকে- ‘ডাক ঢোক, মরার ঢোক, চমকে উঠ, রাজার পাশে থাকবে যেই, ঢেডডেরা গু খাবে সেই, বড় বাড়ির বউ গুলা সামাল’। কী আশ্চর্য! অন্যসব কিছুর মতোই সাবলীলভাবে মান্দি খেলার সামাল ধ্বনি পর্যন্ত বদলে গেছে।

বিশ্বের প্রায় প্রতিটি জাতি-সম্প্রদায়ের যেমন নিজস্ব সমাজ সংস্কৃতি প্রথার হাজারো রীতিনীতি আছে তেমনি আছে তাঁর বিনোদন শারিরীক কসরতের স্বার্থে উদ্ভাবিত নিজস্ব খেলাধূলা। এরমধ্যে কোন কোনোটি পেয়েছে ব্যাপকতা, সার্বজনীনতা, লাভ করেছে বিশ্ব স্বীকৃতি। মান্দি জাতিরও নিজস্ব খেলাধূলা আছে। কিন্তু হায়! এই খেলা গুলো আর খেলা হয়ে উঠে না, না খেললে তো আম্বি-আচ্ছুর উদ্ভাবিত এসব খেলা হারিয়ে যাবে। হারালে আমরা হারাবো নিজ মান্দি জাতির সৃষ্টিশীল সম্পদ।

একবার তর্কের জেরে এক বন্ধু বলছিলেন যে, খেলার-ও কি কোন জাতিগত দিক আছে? আছে বৈকি! সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে যে খেলা গুলো বিশ্বে পরিভ্রমন করেছে সে-ই খেলা গুলোই আজ বিশ্ব নন্দিত। ফুটবল ক্রিকেটের জন্মদাতা বৃটিশের খেলা এখন দুনিয়াব্যাপী সমাদৃত। অনুরূপভাবে দাবা-ব্যাটমিন্টন (ভারত), টেনিস (ফ্রান্স)। চাইনিজ’দেরও নিজস্ব খেলা আছে- উশু (মার্শাল আর্ট)। স্পেনিশদের জাতীয় খেলা ষাঁড়ের লড়াই। আরেকটি জনপ্রিয় খেলার নাম প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, জাপানিদের ঐতিহ্যবাহী ‘সুমু খেলা’। জনপ্রিয় হলেও জাপানিরা ছাড়া সুমু খেলা কেউ খেলে না। কথা হল, সব জাতিগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মাঝেই আছে নিজস্ব খেলাধূলা, সে গুলো তাঁদের গর্ব করবার বিষয়।

মান্দি জাতির’ও আছে নিজস্ব খেলাধূলা, যা হাজার বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। ভুলবশত অনেকেই ভুল বুলি আওড়ান- মান্দিদের খেলা হাজার বছর আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এটি চরম অসত্য বাক্য। আমি বাল্যবেলা বাল্যবন্ধুদের সাথে অন্যান্য স্বদেশী বিদেশী খেলার সাথে মান্দি খেলা খেলেছি। এখনকার ছেলে মেয়েরা মান্দি খেলা খেলে না এই-যা। খুঁজলে অনেক মান্দি ছেলে মেয়ে হয়-তো বেরোবে যাঁরা মান্দি খেলার নাম পর্যন্ত শোনেননি। তাঁদের অশ্রুত এমন কয়েকটি মান্দি খেলার নাম- গিলা খাল্লা, দেলাং খাল্লা, ফুল খাল্লা, দ্রি-মিনজি, সা’আক মামা, মাইজিং জিং, ওয়াফং সাল্লা, গাংগি সিক্কা, চিথিম দক্কা, নাখ্রেক ফাল্লা, নকদাং দাক্কা, গোলা দাবারি ইত্যাদি।

একসময়ের মান্দি ছেলেমেয়েরা এসব মান্দি খেলায় মেতে থাকতো। মান্দি খেলার রবে সদা সজাগ সচকিত থাকতো মান্দি এলাকা, মান্দি পাহাড়। কিন্তু এখন? হায়! মান্দি ছেলে মেয়েরা আর মান্দি খেলা খেলে না, খেলে ভিনদেশী খেলা। শহরে বেড়ে উঠা মান্দি ছেলে মেয়েদের কথা না-হয় ছেড়েই দিলাম কিন্তু গাঁয়ের আলো বাতাস পেয়ে যে ছেলে মেয়েরা শৈশব-কৈশোর পার করছে তাঁরা? না, তাঁরাও আর মান্দি খেলা খেলে না, খেলে অন্য খেলা। তা-খেলুক। খেলতে মানা নেই। খেলা সার্বজনীন। এই খেলা যখন বিশ্ব ভাতৃত্ব বন্ধনে দৃঢ় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে সেখানে খেলা নিয়ে বাড়তি বলা মনে করি নিষ্প্রয়োজন। তবু বলতে হয়, অধিপতি মহলের সেইসব দাপুটে খেলার ভিড়ে কি করে হারিয়ে যায় আমাদের মান্দি খেলা? কই শক্তিমানদের খেলা তো হারিয়ে যেতে দেখি না বরং দেখি সার্বজনীনতার প্রবল জোয়ার। পাকা খেলারামের মতোই তাঁরা অবিরাম খেলে চলে, খেলে যায়, অন্যদেরও খেলায়। আর আমাদের অজান্তেই ভিনদেশী খেলা দখল নেয় আমাদের মাঠ, মগজ-মনন। আমরা শুধু নির্বাক তাকিয়ে আসামীর মতো দু-হাত উপরে তুলি।

শেয়ার করুন

কমেন্টবক্স

আপনিও স্ব মতামত দিন