স্বাপ্নিক স্বপ্না আজিমের পথচলা

image
স্বপ্না আজিম। ছবি: সংগৃহীত

প্রকাশ: ২০২১/০৩/১৬ ০২:৩৭

জীবিকার্জনে গারো নারীরা সবচেয়ে বেশি সৌন্দর্য সেবার খাতে নিয়োজিত থাকলেও আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর মতো গারোদের বড় প্রতিষ্ঠিত কোন বিউটি পার্লার নেই। অথচ গারো নারীদের শ্রমে-ঘামে চলে এক একটি বিউটি পার্লার। না থাকার এই তাগাদা এবং কর্মসংস্থান তৈরীর লক্ষ্যেই ২০০৭ সালে স্বপ্না আজিম নামের এক গারো নারী উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠা করেন ‘বৈশাখী বিউটি পার্লার’। রাজধানীর মহাখালীর ওয়্যারলেস গেট সংলগ্ন এর অবস্থান। ২ জন বিউটিশিয়ান নিয়ে কাজ শুরু করলেও বর্তমানে পার্লারটিতে কর্মরত কর্মীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ জনে।

ময়মনসিংহ ধোবাউড়া চন্দ্রকোনার মেয়ে স্বপ্না আজিম। তিনি দীর্ঘ বাইশ বছর (১৯৯৪-২০১৬) কাজ করেছেন সিটিসেল মোবাইল কোম্পানিতে। ২০০৮ সালে স্বামী মারা যাবার পর একমাত্র মেয়েকে নিয়েই তাঁর দোকলা সংসার। মেয়ে পড়াশোনা করছেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট কলেজে।

চাকরি করার পরও কেন পার্লার খুললেন এমন প্রশ্ন ছুঁড়লে জনজাতির কন্ঠকে স্বপ্না আজিম বলেন, ‘গারো নারীদের একটা বড় অংশ বিউটিশিয়ান হিসেবে কাজ করে। কাজ করতে গিয়ে এই সেক্টরেও নারীদের বেগ পেতে হয়। কাজ শিখতে হয়, কাজ না জানলে বড় পার্লার গুলো নিতে চায় না, ফলে ছোট পার্লার গুলোতে কাজ শিখতে গিয়ে অনেকেই নানা সমস্যায় পড়ে; কর্মসংস্থান ও এইসব নানা সমস্যার কথা মাথায় রেখেই পার্লার খুলি।’

শুরুর দিককার কথা জানাতে গিয়ে বললেন, ‘ব্যবসাতে সব সময় প্রতিযোগিতা থাকে। আপনি যে ব্যবসাই করতে যান না কেন সেখানে তুমুল প্রতিযোগিতা থাকবে, এই প্রতিযোগিতার মাঝেই আপনাকে জায়গা করে নিতে হবে। কেউ জায়গা করে দিবে না, আপনাকেই ঠেলেঠুলে জায়গা তৈরী করে নিতে হবে। যখন নতুন পার্লার খুলি তখন সেবাগ্রহীতা তেমন একটা আসতো না, ধীরে ধীরে ভালো সেবাদানের মাধ্যমে কাস্টমার আসা শুরু করে। এখন আশেপাশের পার্লারের চেয়ে আমার পার্লারেই বেশি কাস্টমাস আসে।’

পার্লার শুরুর এক বছরের মাথায় স্বামীকে হারাই। একসাথে ঘর-সংসার, চাকরি অন্যদিকে ব্যবসা- তখনকার দিনগুলো ছিল সত্যিই চ্যালেঞ্জের। দুঃসাহসের সাথে সেইসব দিন পার করেছি, এক নিঃশ্বাসে বলেন স্বপ্না।

এখন স্বপ্না কেবল নিজের পার্লার নিয়েই স্বপ্ন দেখেন না। গারো নারী উদ্যোক্তা তৈরী ও পার্লার ব্যবসায়ীদের নিয়ে কীভাবে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করা যায় প্রতিনিয়ত সেই দিশা খুঁজেন। এ লক্ষ্যেই ২০২০ সালে কয়েকজন গারো নারী বিউটি পার্লার মালিকদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ গারো বিউটি পার্লার ওনার্স ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ নামের একটি সংগঠন। তিনি এ সংগঠনের রানিং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সংগঠনটির সরকারি রেজিস্ট্রেশনের কাজ চলছে। রেজিস্ট্রার্ড হয়ে গেলে বিভিন্ন সরকারি সহযোগিতা পেতে সুবিধা হবে বলে আশা ব্যক্ত করেন এই নারী উদ্যোক্তা।

সংগঠনটির সাথে ঢাকার ৩০টি পার্লার যুক্ত আছে। চট্টগ্রাম, বগুড়া, সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকার আশেপাশের গারো মালিকানায় পরিচালিত পার্লার গুলোও আছে যুক্ত হবার প্রক্রিয়ায়। ইতোমধ্যে, সংগঠনটির সার্বিক সহযোগিতায় করোনায় বন্ধ হয়ে যাওয়া মোহম্মদপুরের গ্ল্যামার্স ওয়ার্ল্ড এণ্ড ম্যাক ওভার নামের একটি পার্লার রি-ওপেন করা হয়েছে। শাহজাদপুরের বেবী দিও’র গ্রেস বিউটি পার্লার পুনরায় খুলতে সংগঠনটি সাধ্যমতো সহযোগিতা করে যাচ্ছে।

করোনা মহামারীর যাঁতাকলে ছোট ছোট অনেক পার্লার বন্ধ হয়ে গেছে। সেগুলো পুনরায় সচল করতে সহযোগিতা, আর্থিক প্রণোদনা জরুরি। সরকারের কাছে সেই দাবি জানিয়ে আসছে গারো বিউটি পার্লার ওনার্স ওয়েলফেয়ার সোসাইটি।

স্বপ্নাদের সহযোগিতায় বিত্তবানেরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেই পারে। এতে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা গারো জনগোষ্ঠী এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।

আশা রাখি নানান বাধাঁ, বিপত্তি কাটিয়ে স্বপ্না এগিয়ে যাবে; এগিয়ে যাক, অর্জন করুক অভীষ্ট লক্ষ্য। কেননা স্বপ্নারা এগিয়ে গেলেই এগিয়ে যাবে গারো জাতি! এগোবে বাংলাদেশ!

শেয়ার করুন

কমেন্টবক্স

আপনিও স্ব মতামত দিন