সমতলের আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ বাস্তবায়নে আরো স্বচ্ছতা ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা চাই

image
—লেখক

প্রকাশ: ২০২০/০৬/২২ ০২:৩৩

দেশের দুই তৃতীয়াংশ আদিবাসী জনগণ বসবাস করে সমতলের অঞ্চলের বিভিন্ন জেলাগুলোতে। যাদের জনসংখ্যা হবে ২০ লক্ষাধিক এবং জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪০টির ওপরে। সরকারের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনের নতুন তফসিল (২০১৯) অনুযায়ী, সমতলেই ৩৮ টি জাতির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এসব আদিবাসীরা ঐতিহাসিকভাবেই অনেক অবহেলিত ও প্রান্তিক। কিন্তু সমতলের আদিবাসীরা বরাবরই জাতীয় বাজেটে উপেক্ষিত থাকে, জনসংখ্যা অনুযায়ী তারা পর্যাপ্ত বরাদ্দ পায় না। তাদের জন্য এখন পর্যন্ত কোন বিশেষ মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় বাজেটে তাদের গুরুত্ব নেই। সেজন্য সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার দাবি অনেকদিন ধরে আদিবাসীরা জানিয়ে আসছে। তাদের জন্য বরাদ্দ বলতে, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে ‘বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” নামে একটি থোক বরাদ্দ অনেক বছর ধরে চালু হয়ে আসছে। এ থোক বরাদ্দটি আবার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতার মধ্যেও দেখানো হয়। কিন্তু এই থোক বরাদ্দের অর্থ বাস্তবায়নে অনেক জটিলতা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে। কারণ এখানে সমতল আদিবাসীদের সরাসরি কোন অংশগ্রহণ বা ক্ষমতা নেই। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন মূখ্য সচিবের অধীনে বরাদ্দের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে উন্নয়ন মূলক প্রকল্প নিয়ে অর্থ বন্টন করা হয়। আরেকটি অংশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে সরাসরি আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মাঝে এককালীন শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়। তবে অনেক উপজেলায় যোগাযোগের সুবিধার্থে স্থানীয় আদিবাসী প্রতিনিধিকে এই বরাদ্দ বাস্তবায়ন কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয়। আদিবাসীদের মাঝে এ বরাদ্দের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে আদিবাসীদের সরাসরি যুক্ত করে কোন নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুপস্থিত।

সমতলের আদিবাসীদের জন্য থোক বরাদ্দ বাস্তবায়নে যে অনিয়ম ও দুর্বলতাগুলোর অভিযোগ পাওয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে- দেশের আদিবাসী অধ্যুষিত প্রত্যেক উপজেলার আদিবাসীরা একসঙ্গে প্রতিবছর এ বরাদ্দ পায় না। বেশ কিছু উপজেলা আছে যেখানে একবছর বরাদ্দ হলে পরের বছর সে উপজেলাগুলো বরাদ্দ শূন্য থাকে। লবিং ও শক্ত যোগাযোগের কারণে উপজেলাভিত্তিক এ বরাদ্দের কম- বেশিও হয়ে থাকে। এমনও দেখা যায়, কোন কোন উপজেলায় কোন চোখে পড়ার মতো আদিবাসী নেই কিন্তু সে উপজেলায় বিরাট অংকের বরাদ্দ হয়ে আসছে যা পরে অ-আদিবাসীদের মাঝে বন্টন করার অভিযোগ পাওয়া যায়। আবার বেশি আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে কম বরাদ্দ বা বরাদ্দ শূন্যও থাকে। আদিবাসীদের জন্য গ্রহণীয় প্রকল্পগুলো অনেক সময় তাদের মূল সমস্যা বা চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে হয় না। আবার কোনো কোনা উপজেলায় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মাঝে ছাত্র বৃত্তি বা কোন প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দিতেও গরীব আদিবাসীদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে অগ্রিম টাকা আদায় করে নেওয়া হয়। এসব টাকা আদায় কাজে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির আদিবাসী প্রতিনিধি সদস্যকেও ব্যবহার করা হয়। আবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে সরাসরি যে এককালীন শিক্ষাবৃত্তি দেয়া হয় সেই তালিকাতেও অনেক অ-আদিবাসীদের নাম পাওয়া যায়। সরাসরি আদিবাসীদের যুক্ত করে শিক্ষাবৃত্তির জন্য আদিবাসী শিক্ষার্থীর তালিকা বাছাইকরণের কোন কমিটি না থাকার কারণেও কারো প্ররোচনায় অ-আদিবাসী শিক্ষার্থীদের নামগুলো চলে আসতে পারে।

গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রীর বাজেট পেশের পর সমতলের আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ খোঁজা শুরু করি। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কর্মসূচির তালিকার মধ্যে পাওয়া গেল বরাবরের মতো এবারও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে সমতলের আদিবাসীদের জন্য বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত) নামে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য এখাতে বরাদ্দের প্রস্তাব আসছে ৮০ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে খাতে বরাদ্দ ছিল ৫০ কোটি টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪০ কোটি টাকা, তার আগের বছর ৩০ কোটি টাকা। তবে, এবার একটু ভালো দিক যে প্রতিবছর খাতে ১০ কোটি টাকা বৃদ্ধির জায়গায় এবার বেড়েছে ৩০ কোটি টাকা।

এছাড়া মৎস প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সমতল ভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক জীবন মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সমন্বিত প্রাণি সম্পদ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৬ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা। এই প্রকল্প এই বাজেটে প্রথম নতুন সংযোজন হিসেবে দেখলাম। এটি আরেকটি ভালো সূচনা বলা যায়। এভাবে প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দ হলে সমতলের আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ বেড়ে যাবে। কিন্তু বড় সমস্যাটি হলো, এসব বাজেট বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা নীতিমালা নেই। যাদের জন্য বাজেট তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ মতামত ছাড়াই বাজেট তৈরি হয় আবার তাদেরকে অন্তর্ভূক্তি ছাড়াই বাজেট বাস্তবায়িত হয়। বাজেট বাস্তবায়নে কোন জবাবদিহিতা পর্যালোচনাও নেই।

আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” থোক বরাদ্দে ৮০ কোটি টাকা এবং মৎস ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সমন্বিত প্রাণি সম্পদ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৬ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা। সুতরাং, সমতলের আদিবাসীদের জন্য এই দুইখাতে মোট বরাদ্দ ১২৬ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা। আগামী অর্থবছরের জন্য এ বরাদ্দ যদি সমতলের ১২০ টি উপজেলায় বিভাজন করে দেয়া হয় তাহলে প্রতি উপজেলায় বরাদ্দ পড়বে ১ কোটি টাকারও ওপরে। আবার যদি ২৪০ উপজেলার মধ্যে বিভাজন করা হয় তাহলে প্রতি উপজেলায় পড়বে ৫০ লক্ষ টাকারও ওপরে। কোন ধরনের লবিং ও তোড়জোড় ছাড়াই এ বরাদ্দ উপজেলাভিত্তিক পৌঁছে যাওয়ার কথা! কিন্তু এ বরাদ্দ সামান্য হলেও পরিকল্পিত কর্মসূচির মাধ্যমে আদিবাসীদের প্রকৃত উন্নয়ন চাহিদা প্রাধান্য দিয়ে অনেক ভাল কাজ করা সম্ভব। তাই এ বরাদ্দ বাস্তবায়নে আদিবাসীদের সরাসরি অংশগ্রহণে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত। এ বরাদ্দের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন কমিটি থাকতে পারে মন্ত্রণালয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে। যেখানে অধিকাংশ সদস্য থাকবে আদিবাসীদের মধ্য থেকেই। আদিবাসীরাই সিদ্ধান্ত নিবে তাদের অবস্থার উন্নয়নে কিকি ধরণের কার্যক্রম হাতে নিলে সুবিধা হবে এবং তা কিভাবে বাস্তবায়িত হবে! আদিবাসীদের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া কোন কর্মসূচি তাদের সুফল বয়ে আনতে পারে না বলে এ বিষয়টিকে সরকারের গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত।

লেখক: কেন্দ্রীয় সদস্য, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম

শেয়ার করুন

কমেন্টবক্স

আপনিও স্ব মতামত দিন