বাজেট সংশোধনীতে আদিবাসী প্রশ্ন ও ‘থোক বরাদ্দ’ প্রসঙ্গ

image
—লেখক

প্রকাশ: ২০২০/০৬/১৫ ০২:০৩

বাজেটের ‘থোক বরাদ্দ’ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়েও স্বচ্ছ জ্ঞান রাখতাম না। দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই ব্যক্তিগতভাবে আমি অর্থনীতির ছাত্র নই, কোনোকালেও অর্থনীতি নিয়ে আমি পড়ি নাই, পড়ার সুযোগও হয় নাই, অর্থনীতি বিষয়টা আমার কাছে পাথর ভাঙার মতোন শক্ত লাগে। আর অঙ্কশাস্ত্রে নিপাট কাঁচা বলে এসব অর্থনীতির ভাষা-হিসাব নিকাশ বুঝি কম। হিসেবে কাঁচা বলে বাজারে প্রায়ই ঠকতে হয়, ধরুণ জিনিস ক্রয় করতে গিয়ে খরচ হল ২৭০ টাকা দোকানিকে দিলাম ৫০০ টাকার কচকচে নোট। চতুর দোকানি তাড়াহুড়ো করে ১৩০ টাকা ফেরৎ দিয়ে অন্য কাস্টমারের খেদমত করা শুরু করলে আমি সরল মনে চলে আসি। মন কচলাতে থাকে, বাসায় ফিরতে ফিরতে রাস্তাজুড়ে হিসেব কষি, শেষ অবধি বাসায় পৌঁছে একজনের সাহায্যে যখন অঙ্কেরলীলা সাঙ্গ করি তখন আর করার কিছু থাকে না! ১০০ টাকা গচ্চা খাই। এমন অঙ্কের জাহাজ আমি। তবে ঠেকে ঠকে শিখতে শিখতে বাজেটের ‘থোক বরাদ্দ’ বিষয়ে কিছুটা হলেও জানতে পেরেছি, প্রয়োজনে জানতে হয়েছে। এই ‘থোক বরাদ্দ’ বিষয়টা উপকারভোগীদের আত্মমর্যাদার প্রশ্নে আঘাত হানবার মতো বিষয়।

আলোচিত ‘থোক বরাদ্দ’ আসলে কী? শব্দগত দিক থেকে থোক অর্থ গুগল জানাচ্ছে গুচ্ছ, মোট, রাশি বা দফা। সাধারণত বাজেটে থোক বরাদ্দ জরুরী কোনো কাজের জন্যে বা প্রয়োজন হতে পারে কিংবা যে বিষয়ে জানা নেই কিন্তু অর্থের চাহিদা আছে এ ধরণের খাতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়াকে থোক বরাদ্দ বলা হয়। যেমন এবারের ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করোনাখাতে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এই টাকা করোনাখাতে ব্যয় হবে। এ নিয়ে দেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ বিশিষ্টজনেরা বিরূপ মন্তব্য করেছেন, ‘করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর সরকার কী এখনো বুঝতে পারেনি কী করতে হবে বা না হবে?’ এই আলাপে আমি আর বাড়তি বাগাড় মারতে চাই না, ধরেই নিচ্ছি সরকার বুঝতে পেরেছে এবং সেয়ানা বলেই থোক বাজেট বরাদ্দ করেছে। আলাপের প্রসঙ্গে ফিরি।

সমতলের পিছিয়ে পড়া আদিবাসী মানুষের আর্থ-সামাজিক জীবনমান উন্নয়নে তথাকথিত ‘থোক বরাদ্দ’ দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন উত্থাপন করা যেতে পারে, পিছিয়ে থাকা প্রান্তিক এই মানুষদের জীবনমান উন্নয়নে ‘থোক বরাদ্দ’ কেন? মূল বাজেটে অন্তর্ভূক্ত নয় কেন? রাষ্ট্র পিছিয়ে পড়া এইসব জনগোষ্ঠীর বিষয়ে এখনো অবগত না নাকি করণীয় বিষয়ে বুঝে উঠতে পারছে না? কোনটা?

থোক বরাদ্দে অর্থ ব্যয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা গৃহীত হয় না। এ কারণে থোক বরাদ্দের অর্থ অনেক সময় প্রচুর অপচয় হয়। চুরি, লুণ্ঠন, ভাগ-বন্টন হয়। দুর্নীতি হলেও চাহিদা প্রচুর বিধায় প্রতিবছর বরাদ্দ রাখতেই হয়। থোক বরাদ্দের টাকা কীভাবে ব্যয় হবে তাঁর পরিকল্পনা মূল কাঠামোতে অনেক সময় উল্লেখ থাকে না। ফলে অনেক সময় উপকার প্রত্যাশীদের নিকট অর্থ ঠিক মতো পৌঁছে না, নগর থেকে প্রান্তিক এলাকায় পৌঁছলেও অর্থের আকারে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এতো পরিবর্তনে কী আর জীবনমানে উন্নয়ন আসে? আসে না। ফলে পিছিয়ে পড়া জীবন আরও পিছিয়ে পড়ে।

থোক বরাদ্দকৃত অর্থের বিষয়টা আলোচ্যের। সমতলে আদিবাসী মানুষের সংখ্যা ২০ লাখ (যদিও মতভেদ আছে), এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে সমতলের আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে থোক বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা। বিশালসংখ্যক এই মানুষদের তুলনায় অঙ্কটা নেহায়েত সামান্য। কাজেই অর্থের পরিমাণ বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। অন্যদিকে যে পদ্ধতিতে এই অর্থ বন্টন হয় সেখানে দেখা যায়, এক উপজেলার উপকারভোগী এক বছর সুবিধা পেলে অন্য বছর কিংবা কয়েক বছর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। এসব নানাবিধ সমস্যামালার জন্যে প্রীতিভাজনেষু-নেতৃবৃন্দ আদিবাসীদের আর্থ-সামাজিক জীবনমান উন্নয়নে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দের দাবি উর্ধ্বে তুলে ধরছেন, যা যুগোপযোগী বলেই মনে হয়। যেহেতু সমতলের আদিবাসীদের জন্যে পৃথক কোনো মন্ত্রণালয় বা অনুরূপ প্রতিষ্ঠান তৈরী করা হয়নি সেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় একটি দপ্তর খুলে উন্নয়ন বন্টণের সুষম কাজ করার নিরন্তর সৎ পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা! শোনে না বলেই এতোদিনের দাবি সমতলের আদিবাসীদের জন্যে পৃথক মন্ত্রণালয় গঠিত হয় না। এই না হওয়ার মধ্যে কী জনকল্যাণকামী সরকারের মনোভাব প্রকাশ পায়?

আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য আগামী অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা। যদিও এটি শুধু পাহাড়ের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের জন্য বরাদ্দ নয়। এই মন্ত্রণালয়ের সব পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় এবং পাহাড়ি জাতিসত্তার মানুষ ছাড়াও প্রায় সমপরিমাণ পুনর্বাসিত বাঙালি মানুষের বাজেটও এখানে অন্তর্ভুক্ত। কেবল পাহাড়ি আদিবাসী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সমুদয় অর্থ ব্যয়িত হবে এমন ভেবে আটখানা হওয়ার কোনো কারণ নেই।

যে প্রস্তাবিত বাজেট মহান সংসদে পেশ হয়েছে সেটি চূড়ান্ত নয়, সম্পূরক বাজেট সংযুক্তির মাধ্যমে বাজেটে সংশোধন আনা যায়। আমি মনে করি করোনাকালের দুঃসহ এই সময়ে আদিবাসী মানুষের যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে বাজেটে আদিবাসীদের বিষয়টি গুরুত্ব যত্ন সহকারে দেখা উচিত। করোনার প্রাদুর্ভাব থেকে চিরজনমদুঃখী আদিবাসী মানুষকে বাঁচাতে সরকার আদিবাসীদের দাবি মেনে নিক, এ চাওয়া কী খুব বেশি চাওয়া হবে? এই চাওয়া পূরণে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মাঝে যিনিরা সংসদ সদস্য আছেন উনারা উত্তর দায়িত্ব পালন করবেন, দলের গণ্ডি পেরিয়ে আপন জাতিসত্তার দিকে নজর দিবেন এমন প্রত্যাশা সবার। বিষয়টির সন্তোষজনক সুরাহার্থে আদিবাসী সাংসদদের দিকে ড্যাবড্যাব চোখে তাকিয়ে রইলাম।

শেয়ার করুন

কমেন্টবক্স

আপনিও স্ব মতামত দিন