সজারু খ্রিষ্টান, পুঁটি মাছ হিন্দু!

image
—লেখক

প্রকাশ: ২০২০/০৮/২৫ ০১:৩৮

প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে হিন্দু-খ্রিষ্টান গত হলে হয় যাবে স্বর্গে নয়তো নরকে, মুসলিম ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাহি রাজিউন’ হলে বেহেশতে বা দোযখে, সাংসারেক মরলে চিকমাংয়ে, জন্মান্তরবাদীরা মোক্ষ লাভ করা না পর্যন্ত পুনর্জন্ম নিতেই থাকবে (অন্তত সাতবার); যাঁরা নাস্তিক, জড়পদার্থ বা অমর তাঁরা চলতি আলোচনার বাইরে। আউট অব টপিক্স। স্বর্গ নরকে তাদের কিচ্ছু যায় আসে না। রাষ্ট্রের অবস্থাও তা-ই হওয়ার ছিল, স্বর্গ নরক বিষয়ে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা উচিত ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি বাংলাদেশে তা হয়নি।

রাষ্ট্র ধর্ম দিয়ে কী করবে- এমন প্রশ্ন অমূলক নয়। ধর্ম দিয়ে রাষ্ট্র স্বর্গে বা বেহেশতে যাবে? স্বর্গে যেতে হলে পুণ্যের কাজ করা লাগে; হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন, শোষণ, বঞ্চনা, জুলুম, পাপ কার্য করে স্বর্গে যাওয়া যায় না। বিশ্বাস তাই বলে। পৃথিবীর অনেক ধর্ম বলে, জগতে পুণ্য কাজ করা এবং সৃষ্টিকর্তার গিফৎ বন্দনা করাই স্বর্গ লাভের একমাত্র উপায়। ইসলাম অনুযায়ী, আমাদের প্রত্যেকের ঘাড়ে কেরামুন কেতাবুন নামে দুজন ফেরেশতা বসে আছেন, তাঁরা জিন কোডে প্রতিনিয়ত আমাদের পাপ পুণ্যের হিসেব লিখে চলেছেন। হাসরের ময়দানে এই হিসেবের শেষ পাঠ চুকা হবে। সেইদিন নির্ণয় হবে আপনি বেহেশতে যাবেন নাকি দোযখে।

সংবিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ দিয়ে শুরু হয়েছে সংবিধানের পাতা। প্রজাতন্ত্রের প্রথম ভাগের ২ (ক) অংশে বলা হয়েছে- ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করবে।’ সমমর্যাদা ও সমঅধিকার যদি নিশ্চিত করা হয় তবে একটা ধর্মকে আলাদাভাবে মূল্যায়নের উদ্দেশ্য কী? নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা? প্রগতিশীল লেখক তসলিমা নাসরিন বিষয়টিকে এভাবে মূল্যায়ন করেছেন- ‘যে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম গেড়ে বসে, সে সংবিধান থেকে ধর্ম নিরপেক্ষতা পালায়। তাই আধুনিক রাষ্ট্র হওয়ার প্রথম শর্তই ধর্ম নিরপেক্ষ হওয়া।’ এ প্রসঙ্গে আর কথা বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

ইসলামে হযরত মোহাম্মদ (সঃ) কে বলা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। তিনি আল্লাহ রাসুল কর্তৃক প্রেরিত সর্বশেষ নবী যাঁর উপর ইসলামী প্রধান ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। বলার বিষয়, কোরানে রাষ্ট্রধর্ম নামক কোন শব্দের সন্ধান পাওয়া যায় না, এটি ইসলামী ব্যক্তিত্বরাও স্বীকার করেছেন, বলেছেন- ‘রাষ্ট্রধর্ম নামক কোন পরিভাষা তিনি (বিশ্ব নবী) প্রচলন করেন নাই। যে রাষ্ট্রের ভিত তিনি রেখেছিলেন, মদীনা নগর রাষ্ট্রের সেখানে যখন সংবিধান রচনা করছিলেন তখনও তিনি ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন নাই। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি যে সারা আরব উপকূলীয় দ্বীপের মালিক হয়েছিলেন, তাঁর অধীনস্থ হয়েছিল, তখনও তিনি রাষ্ট্রধর্ম বলে কোন শব্দ ব্যবহার করেননি, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হবে এ কথা তিনি বলেননি। এখন যদি আমরা নববিধান হিসেবে সংযোজন করি তাহলে সেটা ইসলামের মাঝে প্রক্ষেপণ করা হয়। অর্থাৎ ভাবটা এমন যে, ইসলাম অসম্পূর্ণ ছিল আর আমরা এটাকে সম্পূর্ণতা দান করছি। এইজন্য খোদার উপর খোদকারী করতে নেই।’

যোগ করে এও বলছেন- ‘রাষ্ট্রের কোন ধর্ম নেই। হযরত খলিফাতুল মসীহ রাবে (রাহেঃ) মতে, যদি রাষ্ট্রের কোন ধর্ম প্রস্তাব করতে হয় তবে তা হচ্ছে একমাত্র এ্যাবস্যুলেট জাস্টিস। যেটাকে নিষ্কলুস ন্যায় প্রতিষ্ঠা, একমাত্র ধর্ম, যেটাকে ধারণ করে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। অর্থাৎ তুমি কে, তুমি কোন বাড়ির ছেলে বা কোন বাড়ির মেয়ে বা তুমি কোন বিশ্বাসে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী এরসাথে কোন রাষ্ট্রের সম্পর্ক নেই, তোমার সাথে আমার সম্পর্ক হচ্ছে সমস্ত নাগরিকের অধিকার সমান এবং প্রাপ্য সমান এবং স্বাধীনতা সমানভাবে সে উপভোগ করবে। রাষ্ট্রের যদি কোন ধর্ম প্রস্তাব করতে হয় তবে সেই ধর্মের নাম হবে এ্যাবস্যুলেট জাস্টিস।’ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের একমাত্র ধর্ম হওয়া উচিত। কে কোন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, পেশার মানুষ এইসব রাষ্ট্রের ধর্তব্যের বিষয় হতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রত্যেক অধিবাসীকে ন্যায় বিচার প্রদান করাই তাঁর ধর্ম হওয়া উচিত।

ধর্ম বিষয়টা মানুষের বিষয়, নাম পরিচয় পরিচিতি মানুষ প্রদান করে। এ প্রসঙ্গে আমার গাঁয়ে প্রচলিত ‘সজারু খ্রিষ্টান’, ‘পুঁটি মাছ হিন্দু’ গল্পটি বলার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। গারো পাহাড়ের কোলে যাদের শৈশব কেটেছে তাঁরা বিভিন্ন শিকারের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠে। বন্য শুকর শিকার, হাতি তাড়ানো, বনে বাদাড়ে পাখি শিকার, নদী-ঝিরি থেকে মাছ ধরা ইত্যাদির মতো প্রকৃতি নির্ভর জীবিকার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত থাকে পাহাড়ের প্রতিটি পুরুষ। ছোটবেলা আমিও বন্ধুদের সাথে বিভিন্ন শিকারে বেড়িয়েছি। আমরা রবিবারে শিকারে যেতাম। কেননা ঐদিন হাফ স্কুল থাকতো, আরেকটি সুবিধা আছে, খ্রিষ্টানদের বিশ্রাম বার। আমরা বিশ্রাম বার সজারু শিকারে বেরুতাম। পাহাড়ে সজারুর গর্তে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া দিতাম, এক পর্যায়ে ধোঁয়া সইতে না পেরে সজারুর দল বেড়িয়ে আসতো, আমরা কায়দা করে ধরে ফেলতাম। অনেকগুলো শিকার একসাথে পেয়ে মন ফুরফুরে লাগতো। আমাদের শিকারী দলের প্রধান মামা সম্পর্কীয় অজিত কোচ ঠাট্টা করে বলতো- ‘সজারু খ্রিষ্টান। রবিবার তাঁরা দলবেধেঁ গির্জা করে। অন্যদিন হলে পাওয়া যেতো না।’ কী আশ্চর্য! অজিত মামার সেই ঠাট্টার ছলে বলা বাক্যটি একসময় সরল এলাকাবাসী বিশ্বাস করে নেয়। পরে সবাই রবিবার গির্জা ভুলে দলে দলে সজারু শিকারে বের হয়। গির্জায় লোকসমাগম কমে যায়। এ আমার দেখা শৈশবের বাস্তব অভিজ্ঞতা।

পুঁটি মাছ হিন্দু- গল্পটি বলবার সময় এসেছে। বর্ষা মরসুম শেষে ভাদ্র মাসে পাহাড়ি ঝিরি, ঝর্ণা, নদীতে অনেক মাছ আসতো, উজানে যাওয়ার জন্য মাছের দল ব্যতিব্যস্ত থাকতো। আমরা ছোট নদী, ঝিরি বাঁধ দিয়ে মাছ ধরতাম। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে যে চারটি মাস পবিত্র বলে বিবেচিত তন্মধ্যে ভাদ্র অন্যতম। শাস্ত্র অনুসারে এই মাস তীর্থযাত্রার জন্য প্রকৃষ্ট। ভাদ্র মাসে বিবাহাদি কার্য নিষিদ্ধ। এই মাসে খাওয়া দাওয়াকে যথাসম্ভব সাধারণ ও সরল করে তোলার নির্দেশ দেয় শাস্ত্র। মশলাদার ও উত্তেজক খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ অনুচিত বলে মনে করে সনাতন বিশ্বাস। তো এই মাসে নদীতে প্রচুর বড় জাতের পুঁটি পাওয়া যেতো। পুঁটিগুলোর প্রত্যেকের মাথায় লাল তিলক দেয়া, বিবাহিত হিন্দু নারীদের মতো। এ দেখে আমার এলাকার গারো জনগোষ্ঠী বলে, পুঁটতি নাতক দে হিন্দু! (পুঁটি মাছ হিন্দু)। ঠিক কে বা কোন গারো এই মিথ চালু করলো জানি না, কালের আবর্তে সেখানকার গারোদের মাঝে এই বিশ্বাস এখনো প্রচলিত আছে। সেই বিশ্বাসের সুর আমার কানে এসেও লেগেছে।

আগেই বলেছি, নাম-পরিচয়, পরিচিতি মানুষ নির্মাণ করে। মানুষের দেয়া পরিচয়ে সবকিছু পরিচিতি পায়। সৃষ্টিতে মানুষই রয়েছে কেন্দ্রবিন্দুতে, মুখ্য চরিত্রে। মানুষই রাষ্ট্র-সমাজ নির্মাণ করে, অনুশাসন-শৃঙ্খলার প্রয়োজনে তৈরী করে আইন, গড়ে তোলে প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান গুলো মানুষের দ্বারা পরিচালিত হয়, কাজেই সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর চরিত্র কী হবে সেটি নির্ভর করে চালকের আসনে বসা মানুষগুলোর উপর। বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। ইসলাম ধর্মকে একক প্রাধান্যে রেখে রাষ্ট্র পরিচালকেরা দেশকে ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। এটি বললেও বক্তব্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়, ধর্মীয় রাষ্ট্রে রূপায়িত করেছেন। ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে দেখা যাবে, হযরত মোহাম্মদ (সঃ) মদীনা নগর প্রতিষ্ঠাকালে যে সংবিধান রচনা করেছেন সেখানে তিনি রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে কোন শব্দ বা পরিভাষা ব্যবহার করেননি। কিন্তু আমাদের দেশে রাষ্ট্রধর্ম বলে নতুন শব্দ যুক্ত হয়েছে। এটা কী খোদার উপর খোদকারী করা নয়? এমন প্রশ্ন খোদ প্রগতিশীল ইসলামিক ব্যক্তিত্বদের।

শেয়ার করুন

কমেন্টবক্স

আপনিও স্ব মতামত দিন