মাহালী কিশোরীর ধর্ষক ‘ফাদার’ ও ইয়ং হেগেলিয়ানদের চোখে যিশু

image
—লেখক

প্রকাশ: ২০২/১০/২০ ০১:৩৬

মুজিব বর্ষ চলছে। এদিকে আমরা অতীব দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছি, এই বছরেই ধর্ষণের মতো সামাজিক ব্যাধির তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে আগের তুলনায়। এই তীব্রতার দরুণ আমার এক বন্ধু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেন। এক অবিমৃশ্য পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তিনি প্রশ্ন করেছেন, ‘দুই হাজার বিশ সাল কি ধর্ষণের বর্ষ হিসেবে পরিগণিত হতে চলেছে?’ তাঁর প্রশ্ন অমূলক নয়। কারণ যেভাবে যে হারে মাঠে-ঘাটে-হাটে সর্বত্র নারী ধর্ষণ, নিপীড়নের শিকার হচ্ছে এতে এই প্রশ্ন আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে তাঁর প্রশ্নের মৌলিকতা যাচাই করা যাবে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন। দেখা যাচ্ছে, গত বছরের তুলনায় ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুণ। অন্যদিকে চলতি বছরে প্রতিদিন অন্তত ৩ জন নারী ধর্ষিত হয়েছেন। আসকের হিসেব মতে, এ বছরে গত ৯ মাসে দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯৭৫টি, এরমধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ২০৮টি। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ৪৩টি। ধর্ষণের শিকার হওয়া ১২ জন আত্মহত্যা করেছেন। বলাবাহুল্য, যেগুলো মিডিয়ায় আসে তার ভিত্তিতেই এই তথ্য। এর বাইরেও অসংখ্য যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটে যা সংবাদ মাধ্যমে আসে না। রয়ে যায় হিসেবের বাইরে। ছাইচাপা অবস্থায়।

দেশে যখন ধর্ষণের এই মহোৎসব চলছে তখন আদিবাসী নারীরাও এর থেকে বাদ যাচ্ছে না। বরং ধর্ষণ-নিপীড়নের আলাদা মোলায়েম টার্গেটে পরিণত হচ্ছে আদিবাসী নারী। নিপীড়ক মহল বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এই জ্ঞান বিদুৎ গতিতে অর্জন করে ফেলে যে, আদিবাসী নারীকে ধর্ষণ-যৌন নিপীড়ন করলে কোন ধরণের বিচার কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার সম্মুখিন হতে হবে না; হলেও খেয়া পার করে ফেলবেন। ছাড় পেয়ে যাবেন। আদিবাসী নারীকে নিপীড়নের লক্ষ্যবস্তুতে যাঁরা পরিণত করেন তাদের এই বোধ অত্যন্ত প্রবল। ফলে শিকার খুব সহজ। হাতের নাগালেই। পার পেয়ে যাওয়ার এই ধারণা, অভ্যাস বা সালিশ কাণ্ডের বলি শত শত আদিবাসী নারী। এই তো গত ৩১ আগস্ট, খাগড়াছড়ি মহালছড়ি থলিপাড়ার নবম শ্রেণীর এক মারমা কিশোরী সেটেলার বাঙালি যুবক আল আমিন (২৪) কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হন। এই ধর্ষণের ঘটনাকে মহালছড়ি সদর ইউপি চেয়ারম্যান ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে। তিনি নিজ উদ্যোগে সালিশ ডেকে দশ হাজার টাকার বিনিময়ে ধর্ষণের মীমাংসা করার চেষ্টা চালান। থলিপাড়ার মতো অসংখ্য ঘটনা উদাহরণ হিসেবে টেনে আনা যাবে যা আদিবাসী নারী ধর্ষণে মীমাংসা বা সালিশের মাধ্যমে ধর্ষকের পার পেয়ে যাওয়াকেই নির্দেশ করবে।

রাজশাহীর তানোরে আদিবাসী কিশোরীর ধর্ষক (ফাদার প্রদীপ গ্রেগরী) পার পেয়ে যেতে যেতে ধরা পড়েছেন। এ খবর আমাদের খুশি করে। কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতা আমাকে খুশি করে না। বিপরীতে বিমর্ষ করে তুলে। যে কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তাঁর বয়স ১৫। হেসে খেলে সোনালি কৈশোর পার করার সময়। এই সময়েই সপ্তম শ্রেণী পড়ুয়া ওই মাহালী কিশোরীর জীবনে নেমে এসেছে কালো অধ্যায়। উপজেলার মুন্ডুমালা মাহালীপাড়ার সাধুজন মেরী ভিয়ান্নী গির্জায় তিন দিন আটকে রেখে ওই মাহালী কিশোরীকে ফাদার ধর্ষণ করেন বলে কিশোরীর ভাই মামলা দায়ের করেন। এরআগে ‘গির্জার কেলেঙ্কারী এড়াতে ধর্ষণকাণ্ড সালিশে নিষ্পত্তির চেষ্টা (ডেইলী স্টার)’ করা হয়। কিন্তু শেষ রক্ষে হয়নি। র‌্যাব-৫ ধর্ষক ফাদারকে গ্রেপ্তার করে। এখানে যে বিষয়টি বলা প্রয়োজন, এই সংক্রান্ত ঘটনা ওই ফাদারের এটাই নতুন নয়। এরআগেও ফাদার প্রদীপ নওগাঁ, নাটোরের চার্চেও এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন এবং সামাজিক সালিশে খেয়া পার করেছেন (৭১ টিভি)। বলতে দ্বিধা নেই, যাঁরা ধর্ষককে খেয়া পার করতে সহায়তা করেছেন তাঁরা নিজেদের অপরাধে জড়িয়েছেন। ধর্ষণের মামলা আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি করা অপরাধ। এই ধরণের কার্যকলাপে জড়িতদের ধর্ষণে সহায়তাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা যায়। ফাদারের ধর্ষণকাণ্ড এড়াতে যাঁরা তদবির করেছেন তাঁরাও এইখানে অপরাধী বলে বিবেচিত হবেন। এই ঘটনায় অনেকজনকে ফাদারের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে দেখেছি। যা অপরাধীর পক্ষ নিয়ে সাফাই গাওয়ার শামিল। অপরাধী যেই হোন না কেন তাকে স্রেফ ‘অপরাধী’ বলে চিহ্নিত করাই শ্রেয়। এটাই আইনের কাজ। আইনকে আইনের মতো কাজ করতে দেয়া উচিত। তবে সমাজে অপরাধ কিছুটা হলেও কমবে।

একজন ধর্মীয় যাজক ধর্ষণের মতো হীন পাপাচারের ঘটনা ঘটাতে পারেন না এমন ধারণা লোকসমাজে প্রচলিত, প্রতিষ্ঠিত। আমারও বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, প্রকৃত খ্রিষ্ট্রের সেবক এমন পাপাচারে কখনো লিপ্ত হতে পারেন না। ফাদার প্রদীপ গ্রেগরী একজন খ্রিস্টের সেবক। কিন্তু তিনি খ্রিস্ট্রীয় আদর্শ মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে গেছেন। তিনি ব্যক্তি লোভ-লালসা সাধনে খ্রিস্টকে ব্যবহার করেছেন মাত্র। ইউরোপীয় দেশগুলোতে একসময় শাসকেরা খ্রিস্ট ধর্মকে পুঁজি করে নানান রাষ্ট্র, শ্রেণীগত স্বার্থ হাসিলে তৎপর ছিলেন। যা ইয়ং হেগেলিয়ানরা তীব্র সমালোচনা করেছেন।

ইয়ং হেগেলিয়ান সদস্যদের একজন ছিলেন ডেভিড স্ট্রস। তিনি ‘যিশুর জীবন’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, যিশুর আদি শিক্ষা বিকৃত হয়ে গেছে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের ব্যবহার হয়েছে বলে তার অধঃপতন ঘটেছে। যিশুর আদি শিক্ষা ছিল নিম্নবর্গের গরীব ও নির্যাতিত মানুষের জন্যে। কিন্তু উপর তলার শ্রেণী ও গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার দরকারে গরীব ও নিঃস্ব জনগণকে শাসন-দমনের জন্য খ্রিস্ট ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে। গরীবদের পরকালের জীবনের লোভ দেখিয়ে ইহকালের প্রাপ্তির কথা ভুলিয়ে রাখা হয়েছে। স্ট্রস এও দাবি করতেন- খ্রিস্ট ধর্মের অবস্থান যিশুর মূল শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কারণ যিশু ছিলেন গরীব ও নির্যাতিত মানুষের নেতা। এই জায়গা থেকে স্ট্রস রাষ্ট্রধর্মের বিরোধিতা করেছেন। শাসকেরা রাষ্ট্র ধর্মকে ব্যবহার করে গরীব ও নিঃস্ব জনগণকে শোষণ ও নির্যাতন করে। জনগণের মুক্তি এবং গরীব নির্যাতিত মানুষের স্বার্থের কথা বলে এই কালেও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার রাষ্ট্রধর্ম বিরোধিতা করবার চিন্তা ও রাজনীতি প্রবল রয়েছে। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে ধর্মের এই রাজনৈতিক প্রয়োগ বিশেষ মাত্রায় লক্ষ্যনীয়।

তবে ধর্মকে মানুষের স্বপক্ষে, মানুষের স্বার্থে ব্যবহারের নজিরও আছে। দৃষ্টান্ত খুঁজতে ইতিহাস কিংবা বাইরের দেশে যাওয়ার দরকার নেই। আমাদের দেশের আদিবাসী সমাজেই এর নজির আছে। আমেরিকান ফাদার ইউজিন হোমরিক মধুপুরের আদিবাসী মানুষের জন্য কী করে গেছেন তা সেখানকার আদিবাসীরা আজীবন মনে রাখবে। একাত্তর সালেও তিনি মুক্তিযোদ্ধা এবং হিন্দু পরিবারদের মিশনে আশ্রয় দিয়েছেন। থাকা খাওয়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। আদিবাসী ও প্রকৃতি বিনাশী ইকোপার্ক প্রকল্পের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্থানীয় মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আদিবাসী ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষায় রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। একইভাবে আমরা ইটালীয় ফাদার পাওলো চেচিরীর কথাও বলতে পারি। তিনি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গার ছিন্নমূল আদিবাসীদের এনে পরম মমতায় রাজশাহী ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মপল্লীতে আবাসনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পর সম্প্রতি মিশন কর্তৃপক্ষ আদিবাসীদের না বলে তাদের জমি ‘দি রাজশাহী খ্রিস্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি’র কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। যার ফলে চরম অনিশ্চয়তা আর উচ্ছেদ আতঙ্কে আদিবাসীরা দিন কাটাচ্ছেন। ধর্ম যে মানুষ, মানুষের কল্যাণের জন্য এটা খুব কম ধর্মীয় নেতাই উপলব্দি করতে পারেন। যাঁরা পারেন তাঁরা হন ফাদার চেচিরী কিংবা হোমরিকের মতোন। যাঁরা ফাদার চেচিরী কিংবা হোমরিকের মতো না হন তাঁরা ধর্মকে কেবল ব্যক্তি গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলে ব্যবহার করেন। এজন্যই হেগেলিয়ানরা প্রশ্ন করার সুযোগ পান।

শেষাংশে বলবো, রাজশাহীর তানোরে গির্জায় যে মাহালী কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছে সে যেন উপযুক্ত বিচার পায়। বিচারের ক্ষেত্রে অপরাধীর ধর্মীয়-সামাজিক স্ট্যাটাস যেন দেখা না হয়। বিচারে তাঁর (ফাদার) ‘অপরাধী’ পরিচয় যেন প্রাধান্য পায়।

শেয়ার করুন

কমেন্টবক্স

আপনিও স্ব মতামত দিন