সোমেশ্বরীর গর্ভে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায় বসতি। ছবি : সংগৃহীত

আমার আম্বির বাড়ি (নানা বাড়ি) সুসং দুর্গাপুরে বিধায় সোমেশ্বরী পাড়ের জনপদ গুলোতে আমার মোটামুটি যাতায়াত ছিলো, এখনো আছে। গ্রীষ্মের ছুটিতে বা অন্য যে কোন সময় বেড়াতে গেলে প্রায়ই ছুটে যেতাম সোমেশ্বরীতে। গোসল করতে। গরমের সময় পাহাড়ী কন্যা সোমেশ্বরীর শীতল পানিতে শরীর ডুবিয়ে রাখার অনুভূতি অবর্ণনীয়। বালুচরে ছোটাছুটি করতাম, সাঁতার কাটতাম। নদীর পূর্ব পাড়ে জেগে ওঠা চর, দ্বীপের মতো। ওই জায়গাটাকে রহস্যময় লাগতো। ওখানে যেতাম না, আজও যাইনি। তখন বালু খেকোদের উৎপাত ছিলনা।

তখন স্থানীয়রা ছোট ছোট নৌকা, ঠ্যালা জাল, বাঁশের ঝুড়ি নিয়ে ছোট গুড়াগাড়া কয়লা তুলতো। শিবগঞ্জ বাজার থেকে ৫-১০ টাকা দিয়ে লাঠির মতো লম্বা লম্বা আখ কিনে নিয়ে আসতাম, আর ডাকুমারার দিকে যে কংক্রিটের নদী রক্ষা বাঁধটি আছে সেখানে বসে চিবিয়ে চিবিয়ে আখের রস খাওয়ার পাশাপাশি সুশান্ত দাদার ছিপ দিয়ে মাছ ধরা দেখতাম।

বিকেলে রানী সোমেশ্বরী নৈসর্গিক রূপ জেগে উঠতো। একদিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা গারো পাহাড়ের সাথে সোমেশ্বরীর মিতালি। যা বর্ণনা দিলাম তার সাথে বর্তমান অবস্থার বিস্তর ফারাক।

এখন আর সোমেশ্বরীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। বালুখেকো শত শত ড্রেজারের কান ফাটানো শব্দে দেড় কিলো দূরেও শান্তি মেলেনা। আর রাতে তো দিগুণ হয়ে যায়। প্রতিদিন হাজার হাজার টন বালু অবৈধ ভাবে উত্তোলন করা হচ্ছে। সোমেশ্বরীর গলা চেপে ধরে রেখেছে প্রভাবশালী মহল। শ্বাস নিতে না পেরে পাহাড়ী কন্যা গ্রাস করছে তারই আশ্রয়ে বাস করা সন্তানদের বসত-ভিটা। এ কাজে রানী সোমেশ্বরীকে সহায়তা করছে উজান থেকে আসা পাহাড়ী ঢল। আর পর্দার আড়ালে বহেরাতলি, কামারখালি, বড়ইকান্দি গ্রামের আদিবাসি সহ শত পরিবারের বসতভিটা গ্রাস করছে প্রভাবশালী বালুখেকোরা।

এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার স্বপ্ন নদীগর্ভে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী কামারখালি বাজার, কামারখালি গ্রাম, বহেরাতলি, বড়ইকান্দি গ্রামগুলো সোমেশ্বরীর বুকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার প্রতিক্ষার প্রহর গুনছে। অনেক ইতিহাসের স্বাক্ষী শতবর্ষি বটগাছটাও আগ্রাসিনী সোমেশ্বরীর ক্ষোভ থেকে রেহাই পায়নি। বাঁধ নির্মাণের দাবিতে গাওয়া নদীপাড়ের যুবক-যুবতীদের হৃদয়স্পর্শী মর্মভেদী গান উপরমহলে পৌঁছালেও ভাঙ্গন খেলায় নিরব দর্শকের ভূমিকায় প্রশাসন। মিথ্যে প্রতিশ্রুতি ছাড়া তাদের কাছে কিছুই আশা করা যায় না। যদিও মাঝে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বালুর বস্তা দিয়ে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিলো, সেখানেও সুনীতির ঘাটতি ছিলো, আর পাহাড়ী নদীর স্রোতে এই বালুর বাঁধ কতক্ষণ আর টিকে? নদীপাড়ের হতভাগাদের গ্রামগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত কী প্রশাসন এভাবেই চুপ করে থাকবে?

আমরা মিথ্যে আশ্বাস চাই না, আমরা বাস্তবায়ন চাই, নিজেদের ভূমিতে থাকতে চাই। উদ্বাস্তু হতে চাই না। আমাদের বাঁচতে দিন। সোমেশ্বরীকে বাঁচান।

লেখক:  লিয়ন লাজারোস রিছিল, শিক্ষার্থী, ঢাবি

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here