নোটস অব আরঙ্গা’র ভোকাল ম্যারাকি তেংনাং সাংমা।

ঢাকা ওয়ানগালায় অংশ নিতে বাংলাদেশে এসেছেন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের জনপ্রিয় ব্যান্ড দল ‘নোটস অব আরঙ্গা’। তারা মূলত রক গান করেন। নোটস অব আরঙ্গার গানগুলো গবেষণাধর্মী। একেকটি গানের প্রেক্ষাপট একেক রকম, বাস্তব জীবনধর্মী। যার ফলে তারা স্বতন্ত্রতা অর্জনের পাশাপাশি লাভ করেছেন অসামান্য খ্যাতি। তাদের গানগুলো গারো হিলসসের বিভিন্ন গারো অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো ঘুরে ঘুরে লেখা। তাদের গানে গারো ইতিহাস, সুপ্রাচীন সংস্কৃতি-প্রথার কথা পাওয়া যায়। ব্যান্ড দলটির প্রতিষ্ঠাতা ভোকাল ম্যারাকি তেংনাং সাংমা। গানগুলো তিনি নিজেই লিখেন। তিনি নৃবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়েও নিয়েছেন উচ্চতর ডিগ্রি। বর্তমানে পিএইচডি করার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

নোটস অব আরঙ্গার ওন ট্র্যাক জাজং গানটি এতোই জনপ্রিয় যে তেংনাং যখন শিলং কিংবা তুরার কোন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যান তখন উনাকে অপরিচিত অনেকেই জাজং নামে ডাকেন। তিনি জাজং নামেও সুপরিচিত। সম্প্রতি রাজধানীর অভিজাত একটি হোটেলে তেংনাং’র সাথে নিরিবিলি পরিবেশে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন জনজাতির কন্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক উন্নয়ন ডি. শিরা। ছোঁড়া সব প্রশ্নে করলেন অকপটে উত্তর।

জনজাতির কন্ঠ: বাংলাদেশে আপনাকে স্বাগতম। কেমন দেখছেন বাংলাদেশ?

ম্যারাকি তেংনাং সাংমা: বাংলাদেশে এটাই আমার প্রথম আসা। বাংলাদেশ অনেক সুন্দর শৃঙ্খল একটা দেশ। এখানকার মানুষগুলো অসাধারণ। সত্যি বলতে, আমার শেকড় কিন্তু বাংলাদেশেই, আমার আম্বি (নানি) দুর্গাপুর বিরিশিরির। বিরিশিরি যাওয়ার ইচ্ছা আছে।

জনজাতি: আপনি নিজেই গান লিখেন। আপনার গানগুলোর প্রেক্ষাপট একেকটার একেক রকম, বাস্তব জীবনধর্মী। গানগুলো কিভাবে লিখেন?

তেংনাং: আমি আমার গানে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সুপ্রাচীন সংস্কৃতি, প্রকৃতির বিষয়গুলো তুলে আনার চেষ্টা করি। বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে ঘুরে গানগুলো লিখি। যেমন- ‘গন্ডা মারি গন্ডা দক’ শিরোনামের গানটি যখন লিখি তখন দক্ষিন গারো হিলসের সিজু এলাকার আত্তং (গারো সম্প্রদায়ের একটি গোষ্ঠী)  অধ্যুষিত অঞ্চলে অনেক দিন অবস্থান করে লিখি। গানটি আত্তং সম্প্রদায়কে নিয়ে লেখা।

জনজাতি: আপনার জনপ্রিয় জাজং গান সম্পর্কে জানতে চাই।

তেংনাং: জাজং গানটি আমি ২০০৭ সালে লিখি। তখন আমি সবেমাত্র কলেজ জীবন শেষ করেছি। সেই সময়ে আমি অনেক দিন নি:সঙ্গ কাটিয়েছি। ২০০৭ সালের দুঃসহ সেই সময়গুলোতেই লেখা আজকের জনপ্রিয় গান জাজং। যা দীর্ঘ বারো বছর পর ২০১৮ সালে রিলিজ করি। জাজং মান্দি শব্দ। যার অর্থ চাঁদ। আকাশে অনেক তারা কিন্তু চাঁদ একটা-ই। সেই সময়ে আমি একা ছিলাম, চাঁদও একা। একা থাকার সূত্রে চাঁদের সাথে আমার গড়ে উঠে গভীর সখ্যতা। অনেক রাত চাঁদ আমাকে সঙ্গ দিয়েছে। আমিও চাঁদকে সঙ্গ দিয়েছি। আমাদের মধ্যে আন্তঃ সম্পর্ক অনেক ভালো ছিল। জুপিটার, প্লুটোর অনেক চাঁদ থাকলেও আমাদের পৃথিবীর একটা-ই চাঁদ। সেই সময়ে বিশাল এই পৃথিবীতে আমারও চাঁদের মতোন নিঃসঙ্গ অবস্থা। চাঁদের কোন বন্ধু নেই, আমার কোন বন্ধু ছিল না।

জনজাতি: দুঃখের সময়ে লেখা সেই গান যখন মানুষ গ্রহন করলো আপনার প্রতিক্রিয়া তখন কেমন ছিল?

তেংনাং: জাজং গানটি জনপ্রিয় হয়েছে, এতে কিছুটা অবাক-ই হয়েছি। গানটিতে মানুষ নিজের দুঃখ বিষাদের চিত্র উপলব্দি করতে পারে বলেই হয়তো নিজের মনে করে সাদরে গ্রহণ করেছে। দুঃখ নিঃসঙ্গতার সেই সময়গুলোতে কোন দুঃখকেই দুঃখ মনে হয়নি। অন্ধকারে যেমন সুই সুতো লাগানো যায় না তেমনি দুঃখের সময় চলাকালে কেউ দুঃখ দিলেও সেটি দুঃখ মনে হয় না।

গানটি এতো-ই জনপ্রিয় হয়েছে যে, তুরা কিংবা শিলংয়ের রাস্তা ধরে যদি হেঁটে যাই তখন অপরিচিত কেউ কেউ আমাকে জাজং নামেই ডাকেন। অনেকে আমাকে জাজং নামেই চিনেন। আমিও এটি উপভোগ করি।

জনজাতি: আপনি জাজং গান লিখেছেন ২০০৭ সালে, আর রিলিজ করেছেন ২০১৮ সালে। এতো দীর্ঘ সময় কেন?

তেংনাং: সময়টা দীর্ঘই বটে। তবে আমি মনে করি যথেষ্ঠ ম্যাচিউরড না হওয়া পর্যন্ত গান রিলিজ করা উচিত নয়। মায়ের পেটে সন্তান পরিণত অবস্থায় না পৌঁছানো পর্যন্ত যেমন শিশু ভূমিষ্ঠ হয় না ঠিক তেমনি একটি গানের ঠিক মতোন ফাইনাল ম্যাচিউরড মাস্টারিং না করা পর্যন্ত গান রিলিজড করা ঠিক না। করলে অনেক ভুলভ্রান্তি থাকবে, সমালোচনার সম্মুখিন হতে হবে। বিষয়টা অপরিণত সময়ে বাচ্চা ডেলিভারী হওয়ার মতোন-ই।

বিয়টাকে আমাদের পানীয় চু’য়ের সাথেও তুলনা করে বলা যেতে পারে। চু জাক দেওয়ার পর সময় না হতেই যদি তুলে ফেলা হয় তবে ঐ চু পানে নেশা হবে না। ইমিচিউরড গান যদি রিলিজ করা হয় তবে তা মানুষের হৃদয় ছুঁতে পারবে না। সেই গান কেবল কানের উপর দিয়ে যাবে, হৃদয় স্পর্শ করবে না।

জনজাতি: আপনার চুপ্পু শিরোনামের গানটি সম্পর্কে অনেকে-ই বলেন যে, গানটি প্রেম ভালোবাসা সম্পর্কিত..

তেংনাং: মানুষের এই ধারণা আমার নজরেও এসেছে। আসলে বিষয়টি এমন নয়। আমার গানের প্রেক্ষাপট কিংবা কাহিনী নিয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে বলা বা লেখা হয়নি। শ্রোতা মহলে এইজন্যেই এই সমস্ত ভুল ধারণা। আপনার সাথেই প্রেক্ষাপটগুলো নিয়ে প্রথম শেয়ার করা। চুপ্পু মান্দি শব্দ। যার অর্থ সাপ। সাপকে আমরা দিয়াবল (শয়তান) হিসেবে চিহ্নিত করে থাকি। বাইবেল বলে, শয়তান সাপের মাধ্যমে এসে প্রথম নারীকে (হবা) প্রলোভন দেখিয়েছে। পরে নারী প্রলোভন দেখিয়েছে পুরুষকে। পুরুষ নারীর প্রলোভনে প্রলুভিত হয়ে পাপ কর্মে লিপ্ত হয়েছে। বর্তমান সমাজে বেশির ভাগ পুরুষের ধ্বংসের কারণ কিন্তু নারী-ই। এই বিষয়গুলো নিয়েই ২০০৮ সালে গানটি লিখি এবং ২০১৫ সালে রেকর্ড করি। গানটি এ বছর (২০১৯) রিলিজ হয়।

জনজাতি: নোটস অব আরঙ্গা’র পথচলার গল্পটা..

তেংনাং: ২০১৫ সালে আমরা নোটস অব আরঙ্গা গঠন করি। তবে এর আগে অন্য আরেকটি ব্যান্ড দলে ছিলাম। দিল্লীতে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান গেমসে আমরা (নোটস অব আরঙ্গা) প্রথম পারফর্ম করি।

জনজাতি: ঢাকা ওয়ানগালায় (১লা নভেম্বর উদযাপিত) স্টেজ পারফর্ম করলেন। কেমন অনুভূতি?

তেংনাং: আগেই বলেছি এখানকার মানুষগুলো অসাধারণ, অমায়িক, যথেষ্ঠ আন্তরিক। ওয়ানগালায় দুপুর থেকেই বিভিন্ন স্টল ঘুরে বেড়িয়েছি। ওয়ানগালার জনসমাগম দেখে মন ভরে গেছে।

জনজাতি: বাংলাদেশ-ভারতের গারো সংস্কৃতির সাদৃশ্য বৈসাদৃশ্য সম্পর্কে দুটি কথা..

তেংনাং: সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য উভয়ই আছে। যেমন- ওয়ানগালা অনুষ্ঠানে স্টেজ পারফর্ম করতে দিয়ে আমি বারবার গারো আদিবাসীদের নিজস্ব ডাক ‘আ হু য়ে..উহু হু হু ’ ডাকটি ডেকেছি। কিন্তু আশানুরূপ সাড়া পাইনি। অনুষ্ঠানে যে মানুষের উপস্থিতি ছিল এটা যদি মেঘালয়ের কোন অনুষ্ঠানে হতো তবে ‘আ হু য়ে..ডাকের সঙ্গে সঙ্গে উহু হু হু..ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে যেতো।

ভারত-বাংলাদেশের গারোদের বৈসাদৃশ্য দূর করতে আমাদের সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি দরকার। দরকার কালচারাল এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম। এতে হয়তো কিছুটা বৈসাদৃশ্য দূর করা যাবে। তবে সংস্কৃতি গড়ে উঠতে সময় লাগবে। এক দুই দিনে সংস্কৃতি গড়ে উঠে না।

জনজাতি: আলাপে আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করার জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী।

তেংনাং: আইয়াও মান্দি স্কা মামুং হঙজাবা!

4 মন্তব্য

  1. আরো দীর্ঘ আলাপচারিতা দরকার ছিল। মনটা ভরল না, তৃষ্ণার্তই থেকে গেলাম।

  2. কোন এক প্রখ্যাত গজল শিল্পী ভারতীয় বাংলাদেশে এসে ঠিক এই অভিযোগটিই করে ছিল যে এদেশের মানুষ গজল গাওয়ার সময় বাহাবা/মারহাবা দিতে জানেনা।আমরাও পারিনি উহু হু হু গগনবিদারী আওয়াজ তুলতে। এপার ওপার যোগাযোগ বাড়াতে হবে।

  3. গান গুলো আমিও শুনেছি অনেক ভালো লেগেছে,
    বাংলাদেশের গারো শিল্পীদের কিছু শিক্ষার আছে তার কাছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here