ডিপ্লাস চিসিম

ডিপ্লাস চিসিম। বডি বিল্ডার। তাকে পুন: পরিচয় করিয়ে দেয়া আবশ্যক বলে মনে হয় না। তিনি এখন সুপরিচিত। গারো জাতিসত্তার টগবগে এই তরুণের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলা ধোবাউড়ার মেকিয়াকান্দা। ৩ ভাই ১ বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় জেষ্ঠ্য। বর্তমানে ঢাকা বনানীর রোস লান্স ব্যায়ামাগারে প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ৫ম মার্সেল রেফ্রিজারেটর কাপ শরীর গঠন প্রতিযোগিতার ৭৫ ক্যাটাগরিতে অংশ নিয়ে জিতেছেন গোল্ড মেডেল। বয়ে এনেছেন গারো জাতির জন্যে সুনাম। রাজধানীর অনামী একটি হোটেলে নিজের সাফল্য, জিম জগতের নানান বিষয়ে খোলাখুলি কথা বললেন, জানালেন বিভিন্ন বিষয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জনজাতির কন্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক উন্নয়ন ডি. শিরা।

জনজাতির কন্ঠ: ৫ম মার্সেল রেফ্রিজারেটর কাপ শরীর গঠন প্রতিযোগিতার ৭৫ ক্যাটাগরিতে গোল্ড মেডেল জিতলেন। অভিনন্দন! কাপ জেতার অনুভূতি শেয়ার করেন।

ডিপ্লাস চিসিম: ধন্যবাদ। শরীর গঠন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে গোল্ড মেডেল জেতা এটাই প্রথম। মার্সেল কাপ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াটাও প্রথম। প্রতিযোগিতায় প্রথম অংশ নিয়েই প্রথম হলাম। তা-ই অনুভূতিটা বেশ ফুরফুরে। এমনিতেও প্রথম কিছুর অনুভূতি একটু আলাদাই থাকে। অনুভূতিটা প্রথম প্রেমের মতোন আর কি! (হাসি)। এই কাপ জেতার মুহূর্ত আমার জন্যে বিশেষ কিছু।

জনজাতি:  তার মানে এটাই ছিল আপনার প্রথম কোন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন?

চিসিম: না। এটা প্রথম নয়। কয়েক মাস আগে অনুষ্ঠিত হওয়া মি. ঢাকা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে সেরা ৬ হই।

জনজাতি: আপনার জিমের জগতে আসার গল্পটা..

চিসিম: আমি থেরাপিস্ট ছিলাম। থেরাপিস্টের যে অফিসে কাজ করতাম বর্তমানে সেটি নাম পরিবর্তন করে হয়েছে হেলদি হোম। সেটি ছেড়ে জিমে ভর্তি হই। রাজীব দা (রাজীব চিসিম) আমাকে জিমে ভর্তি করান। তার হাত ধরেই জিমের জগতে আসা। ধীরে ধীরে জিমের কলাকৌশল রপ্ত করি।

একসময় রোসলান্স স্যার (রোসলান্স মোহাম্মদ হোসেন) আমার শরীরের সেপ দেখে উৎসাহিত করেন। স্যার দেশের বাইরের (ফিলিপাইন) প্রতিযোগিতায় সিলভার মেডেলিস্ট। উনার উৎসাহ নিরন্তর অনুপ্রেরণায় এতোদূর আসা। এই জায়গায় পৌঁছতে তিনি আন্তরিকতার সাথে অনেক সহযোগিতা করেছেন। এখনো সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। থেরাপিস্ট থেকে জিম জগতে আসাটা ছিল আমার জন্যে প্লাস পয়েন্ট।

জনজাতি: আপনি তো রোসলান্স স্যারের জিমেই (রোসলান্স স্টুডি, বনানী) প্রশিক্ষক হিসেবে আছেন..

চিসিম: হ্যাঁ। এখানে প্রায় ৬ বছর হতে চললো। দেশের বড় বড় তারকা শিল্পীরা এখানে জিম করতে আসেন। নাম বলতে গেলে শাকিব খান, নুসরাত ফারিয়া, বাধঁন, অপু বিশ্বাস প্রমুখ। আমি তাদের জিম প্রশিক্ষণে নির্দেশনা দিই।

অপ্রাসঙ্গিক হলেও এখানে একটু শেয়ার করি। আমার দেহ গঠন দেখে ঢালিউডের জনপ্রিয় চিত্র নায়িকা অপু বিশ্বাস ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জগতে কাজ করার অফার দিয়েছিলেন। তখন নিজেকে আরও যোগ্য করে গড়ে তোলা দরকার বলে মনে হয়েছে।

জনজাতি: তারপরও একটি ভিডিও চিত্রে কাজ করেছেন..

চিসিম: মিলার ‘বাঘ আইলো রে..’ শিরোনামের ভিডিও চিত্রটিতে কাজ করেছি। সেখানে ইন্ডিয়ান বক্সারের চরিত্রে অভিনয় করি। ফাইনাল খেলায় আমি হেরে যাই। এই ভিডিও চিত্রে শ্যূট করতে গিয়ে হালকা চোঁট পেয়েছিলাম, যা আমাকে এক সপ্তাহ বিশ্রামে পাঠায়।

মার্সেল কাপ জয়ী অন্যান্য বিজয়ীদের মাঝে ডিপ্লাস চিসিম।

জনজাতি: প্রতিযোগিতার জন্যে আপনি নিজেকে কীভাবে তৈরী করেন?

চিসিম: শরীর গঠন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চাইলে একজন বডি বিল্ডার কে ৩-৪ মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হয়। এজন্যে হার্ড ডায়েটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আমি ১২টা কিংবা বেশি জোর ১২.৩০ এরমধ্যে ঘুমিয়ে খুব সকালে উঠে খালি পেটে কার্ডিও করি, ৮-৯টার মধ্যে নাস্তা সেরে নিই (নাস্তায় ৯টা সেদ্ধ ডিম, এরমধ্যে ৮টা কুসুম ছাড়া), পরে হাল্কা বিশ্রাম। দ্বিতীয় মিলের পর অনুশীলন শুরু করি। এক সপ্তাহের মধ্যে ৬ দিন অনুশীলন করি আর একদিন বিশ্রাম।

আমার দৈনিক ৫টি মিল থাকে। মিলে আলু সেদ্ধ (২০০ গ্রাম), চিকেন বয়েল (২০০গ্রাম), সালাদ (পরিমিত)। মূলত বয়েল জাতীয় খাবারগুলো খাওয়া লাগে। খাবার মেন্যুতে কখনোই জাঙ্ক জাতীয় ফুড থাকতে পারবে না।

জনজাতি: একজন নিম্নবিত্তের পক্ষে বডি বিল্ডার হওয়া তো কঠিন বিষয়..

চিসিম: শুধু কঠিন নয়, অনেক কঠিন। বডি বিল্ড করা সহজ কাজ নয়। এটি যথেষ্ঠ সময় আর সাধনার বিষয়। অন্যদিকে আমার মতন নিম্নবিত্ত আয়ের লোকের পক্ষে বডি বিল্ডিংয়ের উপাদানগুলো যোগাতে নানান বেগ পেতে হয়। পোড়াতে হয় কাঠখড়। এখন আমি যেখানে কাজ করি তার পুরো বেতন দিয়েও বডি বিল্ডিংয়ের অর্ধেক খরচপাতি মেটানো যায় না। তবে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আরও অনেক দূর যাওয়া যাবে।

জনজাতি: আপনার ভবিষৎ ইচ্ছার কথা জানতে চাই।

চিসিম: আমি শরীর গঠন প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছতে চাই। চেষ্টা করছি সে লক্ষ্যে কাজ করার। আগামী ২৭-২৮-২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য মি. বাংলাদেশ প্রতিযোগিতার ৭৫ ক্যাটাগরিতে অংশ নিবো। এই খেলার জন্যেই ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যোগ দিতে পাচ্ছি না। সেক্রিফাইস করতে হচ্ছে। সামনে ভারতে গিয়ে সেদেশের প্রতিযোগিতাগুলোতে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা আছে।

জনজাতি: সময় সুযোগ হলে রেসলিং কিংবা বক্সিং জগতে আসবেন কিনা? শরীর গঠন প্রতিযোগিতাগুলোর চেয়ে এই দুই জগতের মূল্য ও অর্থ বেশি।

চিসিম: সেটা সময় বলে দেবে। এটা সত্য যে, জিমের জগতে অর্থের অভাব। জিমে স্পন্সর পাওয়া বেশ কষ্টকর। তবে গোল্ড মেডেল জেতার পর বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে কাজের অফার পাচ্ছি।

জনজাতি: কালাচাঁদপুরের গারোরা আপনাকে ‘গারো জন সিনা’ বলে ডাকে। আপনার কাছে বিষয়টি কেমন লাগে?

চিসিম: জন সিনা রেসলিং জগতের সুপার স্টার। লিজেন্ড। উনার সাথে আমার তুলনা হয় না। আমি এখনো উনার লেভেলের নই। আমাকে জন সিনার মতো দেখায় বলে হয়তো গারো জন সিনা ডাকে। আমারও মন্দ লাগে না। অনেকেই ভেংচি কেটে নেগেটিভভাবে গারো জন সিনা ডাকটি ডাকে। তখন খারাপ লাগে। তবে আমি নিন্দুকের ধার ধারি না।

জনজাতি: আপনার জন্যে শুভ কামনা।

চিসিম: ধন্যবাদ।

2 মন্তব্য

  1. শুভেচ্ছা, অভিনন্দন শুভ কামনা রইলো ডিপ্লাস চিসিম ভাই।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here