শিউলী আজিম।

তেনজিং ডিব্রা: তখন পড়ন্ত বিকেল। হালকা মেঘাচ্ছন্ন গারো পাহাড়ের আকাশ। এমন বিকেলে কিছুক্ষণ সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছিল বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের অন্যতম ডিফেন্ডার শিউলি আজিমের সাথে। আলাপে জানা গেল অনেক কিছু। খোলামেলা আলাপের কিছু অংশ নিয়ে এই লেখা।

শিউলি আজিম। ধোবাউড়ার কৃতিসন্তান। তিনি অনেকের অনুপ্রেরণা। আদিবাসী তথা গারো সম্প্রদায়ের গর্ব। এরচেয়েও বড় কথা তিনি বাংলাদশের গর্ব, সম্পদ। ধোবাউড়া কলসিন্দুরের নলগড়া ছোট্ট গ্রামে তাঁর জন্ম। গ্রামের মুক্ত পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা-শৈশব। জন্মভূমি প্রকৃতিকে ভালোবাসেন নিজের মতো করে। সাদামাটা জীবনযাপন করতে ভালোবাসেন। তার মতে, ‘আমি সাধারণ পরিবারের মেয়ে। আমার বাবা-মা এখনও ঘরে মাঠে কঠোর পরিশ্রম করেন। কষ্ট করে আমাদের বড় করেছেন। আমি মনে করি বিলাসিতা, নিজেকে নিয়ে গর্ব ও অহংকার করা পতনের মূল কারণ। এছাড়াও সবার আধুনিক লাইফ স্টাইলের মতো আমাকেও ওইরকম করতে হবে বলে আমি মনে করি না। স্বাভাবিক জীবনযাপন আমার কাছে ভালো লাগে।’

জাতীয় দলের এই ডিফেন্ডার আলাপকালে সহজ ভাষায় জানালেন নিজের, এলাকার কথা। বললেন, ‘ধোবাউড়া সদর উপজেলা দূর হওয়াতে কলসিন্দুর রাস্তা-ঘাটের বেহাল অবস্থা। এমন অবস্থার মাঝেই হাঁটাপথে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় মনোযোগ দিয়েছি। ছোটোবেলা থেকেই। তবে ছোটবেলা স্বপ্ন দেখতাম শিক্ষক হওয়ার। সেই স্বপ্ন পূরণ করতেই আমি কিলোর পর কিলো রাস্তা হেঁটে পড়াশুনা চালিয়ে গেছি। মেয়ে মানুষের পক্ষে এতদূর রাস্তা হেঁটে হেঁটে পড়াশোনা করা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। যেহেতু আমি এখন ফুটবলকে জীবনের অংশ হিসেবে নিয়েছি সেহেতু আমি ফুটবলে মনোযোগ দিতে চাই। তাছাড়াও বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের হয়ে নিয়মিত খেললেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। আমি এই বছর কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতাম। করোনা ভাইরাসের কারণে সব আটকে গেলো। তবুও আমি বাড়িতে অবসর সময়ে পড়াশুনা আর ফুটবল প্র্যাকটিস চালিয়ে যাচ্ছি।’ জাতীয় দলের এই ডিফেন্ডারের সাথে আলাপ করে তাঁর মানসিক মনোবল কত দৃঢ় সে সম্পর্কে কিছুটা হলেও জানা গেল। পরিবারের সাপোর্ট তাকে আত্মবিশ্বাসে ভরিয়ে দিয়েছে।

ধোবাউড়া সদর থেকে কলসিন্দুর, নলগড়া গ্রাম নির্জন-নির্জীব। গ্রামের চারদিকে বাঙালী পরিবারের মাঝে ১৮টি গারো পরিবার। চারদিকে সবুজ ধান ক্ষেত। মাঝখানে বাংলাদেশ মহিলা ফুটবল দলের রক্ষণের অন্যতম দেয়াল শিউলির সেই ছোট্ট ঘর। এই ছোট্ট ঘরে বসবাস করেন বাংলাদেশের গর্বিত সোনালী স্বপ্নের একজন ফুটবল কন্যা। যে কন্যা ফুটবল খেলার মাধ্যমে বাংলাদেশকে অন্যতম পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। দেশের জন্য বয়ে এনেছেন সুনাম।

একজন নারী হয়ে ফুটবল খেলেন। নিরাপত্তার বিষয়টা জানতে চেয়েছিলাম। জানালেন নিজের মতো করে, ‘আসলে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বাফুফে আমাদের অনির্দিষ্ট কালের জন্য ছুটি দেয়। মতিঝিলে থাকাকালীন সময়ে নিরাপত্তার কোন খামতি ছিল না। অন্যদিকে গ্রামে আমার সবাই পরিচিত। আমাকে সবাই ভালোবাসে। সেই হিসেবে আমার জন্য আলাদা নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনা। তবে বাংলাদেশের স্বার্থে নিরাপত্তা দরকার। কিন্তু সেভাবে কোনো সুযোগ নাই। আমি খেটে খাওয়া মানুষের সাথে সহজে মিশতে পারি, চলতে পারি। গ্রামের সকল মানুষের সহযোগিতা, সহভাগিতা, ভরসা ও পরিবারের সকল সদস্যের সাপোর্ট পাই। সে হিসেবে কোন সমস্যা হয় না। তবে একটা অনুরোধ ধোবাউড়া প্রশাসন ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা যদি আমাদের সাপোর্ট করার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি করে তাহলে হয়তো আরো ভালো হতো।’

হঠাৎ শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন থেকে নারী ফুটবলার হয়ে উঠার পেছনে অবশ্যই কিছু রহস্য আছে? শিউলী বলেন, ‘আমার গ্রাম নিতাই নদীর পাশে গড়ে উঠেছে। এই গ্রামে ভালো শিক্ষিতজনের বড়ই অভাব। গ্রামের মানুষকে শিক্ষায় এগিয়ে নিতে শিক্ষকতা পেশায় এক ধরণের দুর্বলতা ছিল। কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশুনাকালীন সময়ে স্যার আমাদের একদিন বললো- বাংলাদেশে পুরুষরা যদি ফুটবল খেলে সুনাম অর্জন করতে পারে নারীরা কেন পারবে না? আমাদের দেশে নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে যদি বাংলাদেশ শাসন করতে পারে তাহলে নারী ফুটবল কেন শাসন করতে পারবে না? সেদিন গণিতের মফিজ উদ্দিন স্যারের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে ফুটবলের প্রতি মনোযোগী হই। প্রতিদিন স্কুল চলাকালীন সময়ে প্র্যাকটিস থেকে ধাপে ধাপে ভালো পারফরমেন্স উপহার দিয়ে জাতীয় লেভেলে পৌঁছানো। এই গল্প এখন সবার জানা। দেশের হয়ে ইন্ডিয়া, ভুটান, নেপাল, তাজিকিস্তান, মায়ানমার, চায়না, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দেশগুলোর বিপক্ষে খেলার সুযোগ হয়েছে। এটা ভাবলেই নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে হয়!’

বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিশ্চয় দেখেন? এ বিষয়ে আসতেই একটু হাসলেন। হাসি থামিয়ে বললেন, ‘আমি একটু পিছন থেকে বলি। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ছিলো। কিন্তু ফুটবলে আমি ভালো করছি। দেশের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়েছি। এখন ফুটবলকেই বেশি ভালোবাসি। ফুটবল নিয়েই রোজ স্বপ্ন দেখি। বিশ্বকাপ খেলা এবং অর্জন করা আমার জীবনের বড় স্বপ্ন। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে যারা বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের হয়ে খেলতো তারা অনেকেই বিয়ে করে ফেলেছে। তারা দল থেকে ছিটকে গেছে। এখন আমরাই বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের মধ্যমণি। সেই হিসেবে আমাদের বিশ্বকাপ খেলা এবং কাপ জেতার স্বপ্ন তো অবশ্যই আছে। দায়বদ্ধতাও আছে।’

বাংলাদেশের মানুষের কাছে কোনো প্রত্যাশা? দেশের মানুষের কাছে আমার চাওয়ার কিছু নেই। বরং দেশ ও দেশের মানুষকে ফুটবল খেলার মাধ্যমে কিছু দিতে চাই। তবে চাওয়া এইটুকু আমি যেন সবসময় সুস্থ থাকতে পারি। প্রত্যেকটা খেলায় নিয়মিত হতে পারি। দেশের প্রত্যেকটা মানুষের দোয়া আশীর্বাদ ও সাপোর্ট আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সেই হিসেবে আমার এইটুকুই চাওয়া।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here