অং মারমা
-লেখক

উমেচিং তার পালিত কুকুর ক্যাহ ‘বো ও রাইং’ অং এর প্রতি অনেক্ষণ ধরে রাগল। মনে মনে চেয়েছিল রাতে তাদের খাবার বন্ধ করে রাখবে। কুকুরের দোষ ছিল তার জুম ক্ষেতে বানরের উত্তাপে নীরব ভূমিকা পালন করার। কিন্তু উমেচিং তার প্রিয় কুকুরের প্রতি এতোটা নিষ্ঠুর হতে পারলো না। হাতে ঠাসঠাস দু’একটা মেরে দু’টো গুড় মিশ্রিত অল্প ভাত খেতে দিল তাদের। উমেচিং এর স্বামী হ্লামংচিং তার জুম ক্ষেত নিয়ে যত উদ্বিগ্ন তার চাইতেও উদ্বিগ্ন মেয়ের পড়ালেখা চালানোর অর্থ সংকট নিয়ে। তসালাং লাহ্ (সেপ্টেম্বর মাস ) এর দিকে তার জুমে ধান পাকা শুরু হবে। এইদিকে প্রবল বর্ষণে তার জুম ঘরকে দূর থেকে দেখলে মনে হয় ৮০ বছর বয়সী এক বুড়ি লাঠিতে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও তার জুম ঘরকে আগে ২৫ বছর বয়সী তরুণই দেখাত। এই দুরবস্থার কারণ ছিল অধিক বর্ষণ ও টানটান উত্তেজনা বাতাস।

দু’সপ্তাহ পর…

হ্লামংচিং এর ধারণা, জুম হতে ফসল তোলার আগে মুরগী কেটে পুজো করতে পারলে ভালো ফলস তোলা যায়। অথচ, সে নিজেও বলতে পারে না তার ধারণা কতটুকু ঠিক বা বেঠিক। কিন্তু সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, বিশ্বাস করে পুজো দিলে মা লক্ষী খুশি হয়ে ফসল বাড়িয়ে দেয়। তার চাইতেও বড় কারণ হলো তাকে পুজো দিতে না চাইলেও পাহাড়ের রীতিনীতি অনুযায়ী পুজো দিতে হয়। এই বড় ধারণার ভেতরে আরও বড় ধারণা ছিল যে শনি ও মঙ্গলবার সাপ্তাহিক মঙ্গল দিন। তাই তারা সোমবার দিনের রাতে ঠিক করলো আগামীকালই পুজো দিবে। উমেচিং খুব ভোরে উঠে ভাত বসাল। সাথে নাপ্পি দিয়ে টকপাতায় কাকড়া মিশিয়ে রান্না করে নিল। তার মেয়ে সাইংসাইং মে’কে গুণগুণ করে ইংরেজিতে কি জানি পড়তে শুনলো। পরে দেখল লবণ আর পরিমাণ মতো নেই। তাই তার মেয়ে সাইংসাইং মে’কে বিশ টাকা ধরিয়ে বলল ‘‘ইস্কুল থেকে আসার সময় বাজার থেকে এক কেজি লবণ আনবি আর বাকি টাকায় খাতা কলম নিয়ে তোর বান্ধবী উম্যাসিং কে সাথে নিয়ে দুপুরে খেতে জুমে আসবি।”

হ্লামংচিং ঘুম থেকে উঠে মুখ ধোয়ার পর পরই বাংলা মদে এক চুমুক দিয়ে পরীক্ষা করল মদে ভেজাল আছে কি না। পরে হাফ লিটার মদ, বাঁশ, ভাত-তরকারি, পেঁয়াজ কাচা মরিচ, তেল, হলুদ রসুন যা যা দরকার সবই নিল বাশের তৈরী ঝুড়িতে করে। ক্যা’বো আর রাইং’অং ছুটল উমেচিং এর পিছে পিছে।

দুপুর গড়িয়ে গেল! অথচ সাইংসাইংমে এখনো জুমে পৌঁছাতে না পারাটা ভীষণ রাগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের ইতিমধ্যে। কোনো রকমে লবণের বিকল্প হিসাবে তারা শুকনো বাঁশের পাতা পুড়িয়ে জলে ছেঁকে রান্নায় দিয়ে ভোজন করলো পুজো দেয়া সেই দেশি মুরগী। স্বাদে তেমন খারাপ হলো না মুরগীটা। তবে তার মেয়ের প্রতি রাগের ফলে খাবারটাও আরামদায়ক হলো বলে মনে হলো না। উমেচিং, হ্লামংচিং দু’জনেই মনে মনে ও বলে বলে উভয় ভাবে আচ্ছা বকলো তার মেয়েকে। সন্ধ্যায় আকাশ মেঘে ঢেকে গেল। মাতালি হাওয়া। ধানের গাছ গুলি এদিক ওদিক করে দুলছে। যেকোনো সময় ঝড় বয়ে যেতে পারে জেনে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয় তারা। ক্যা’ বো আর রাইং’ অং এইবার সবার আগে হাঁটা দেয়। উমেচিং বাড়ির উঠোনে এসে দেখলো সাইংসাইংমে’র নিথর দেহ পড়ে আছে কাঁঠাল গাছের পাশে। তার হাতের পাশে আধা কেজি লবণ। স্তনে শকুনে খামচি দেয়ার দাগ আর যৌনীতে রক্তজবার মতো লেগে আছে লাল বর্ণে বয়ে যাওয়া রক্ত…

তার আশাপাশে ক্যা’বো আর রাইং’ অং বসে থাকলো মন খারাপ করে…

লেখক: অং মারমা, কবি ও গল্পকার।

1 মন্তব্য

  1. অং এর লেখার হাত অসাধারণ বলতে হবে। নিত্য ঘটনা প্রবাহ অতি সাধারণ ভাষায় পাঠকের কাছে তুলে ধরার ব্যপারটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। সেই সাথে প্রসংসনীয় তার নিজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে জনসমক্ষে আনার প্রচেষ্টা। লেখককে অনেক ধন্যবাদ ও শুভকামনা জানাই।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here