হাজং সুমন সরকার।

বাংলাদেশ হাজং ছাত্র সংগঠন, শেরপুর জেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাজং সুমন সরকার (৩০) স্ট্রোক করে গত ৮ জুলাই ২০২০ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি উপজেলার বেলতৈল গ্রামের সন্তান সুমন সরকার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হওয়া প্রথম হাজং শিক্ষার্থী। কিন্তু পরিবারের আর্থিক ও ব্যক্তিগত কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা সম্পন্ন না করে পরে তাঁর সুবিধা মতো শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে পড়ালেখা সম্পন্ন করেন। জাতি, সমাজ ও যুবদের নিয়ে সুমনের গঠনমূলক চিন্তা ছিল। তার অন্যতম চেষ্টার কারণে শেরপুর জেলায় হাজং ছাত্রদের সংগঠিত করা সম্ভব হয়েছিল এবং বাহাছাস-এর শেরপুর জেলা শাখা গড়ে ওঠেছিল।

কোভিড-১৯ মহামারির খাদ্য সংকট থেকে অসহায় হাজং পরিবারদের রক্ষা করতেও সে এগিয়ে এসেছিল। আমরা সুমন সরকারের মতো একজন উদীয়মান সুন্দর ও সভ্য মনের যুব সংগঠককে হারালাম। তার চিন্তার লেখনি থেকে একটি লেখা এখানে শেয়ার করছি। যে লেখাটি সুমন গত ১৮ এপ্রিল ২০২০ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেছিল। সুমন হাজংয়ের এ লেখাটি কিছু বানান সম্পাদনা করে হুবহু তোলে ধরতে সহায়তা করেছেন সোহেল হাজং।

হাজং সুমন সরকার

“অনেক দিন আগে কোথাও কারো কাছ থেকে শুনেছিলাম যে ‘এক ক্ষুধার্ত কাক নদীর ধারে এক ক্ষুধার্ত অসহায় মৃত্যু পথযাত্রী মানব শিশুর কাছে দাঁড়িয়েছিল যে, কখন শিশুটি মারা যাবে আর পরে কাকটি তাকে খোবলে খাবে।’ আরেকবার ন্যাশনাল জিওগ্রাফি অথবা ডিসকভারি চ্যানেলে দেখছিলাম অথবা কারো কাছ থেকে শুনেছিলাম যে ‘মৃত্যু পথযাত্রী হরিণ শাবককে আরেক বাঘ পাহারা দিচ্ছিলো কয়েক দিন ধরে (সে নিজে কিছু না খেয়ে) যেন অন্য কোন হিংস্র প্রাণী ঐ হরিণ শাবকটাকে খেতে না পারে। আর যখন শাবকটি মারা যায় তখন সে সেখান থেকে অন্য কোথাও চলে যায়।’

এখন কথা হল যে, বর্তমান সময়ে সারা বিশ্ব আতংকিত করোনাভাইরাস নিয়ে। বিশ্বের বড় বড় উন্নত রাষ্ট্রগুলো করোনা ভাইরাস সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। আর আমাদের মত দেশের কি অবস্থা হতে পারে! মানুষ কত অসহায়, তাই না! নিমিষেই মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে করোনা ভাইরাস। পাশে না থাকতে পারছে পরিবার, না থাকতে পারছে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন। তাই বুঝতেই পারছেন, আমাদের কতটুকু কেমন সচেতন হওয়া উচিত। এবং যারা রোগীদের সেবা যত্ন করে যাচ্ছেন তারা কতটুকু ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিচ্ছেন। তাদের প্রতি আমাদের সবার কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত। তারা যেন তাদের দায়িত্ব সুস্থভাবে, সুন্দরভাবে পালন করতে পারে। সৃষ্টিকর্তা যেন তাদের কোন বিপদে না ফেলে। তারা যেন ভাল থাকে।

এখন কথা হল ওদেরকে নিয়ে, যারা অসহায় মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে খেতে না পারা মানুষের হক মেরে খাচ্ছে! যারা এই ভয়ংকর সময়ে, এই লকডাউনে বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারছেনা, তাদের মুখের খাবার কেড়ে নিচ্ছে! তারা কি ঐ কাকের চেয়ে নিকৃষ্ট নয়? তারা কি ঐ বনের বাঘের চেয়ে নিকৃষ্ট নয়? কারণ যে কাক অসহায় নিথর শিশুটির প্রাণ না যাওয়া পর্যন্ত কোন আঁচর দেয়নি, যে হিংস্র বাঘ হরিণ শাবকের প্রাণ না যাওয়া পর্যন্ত স্থান ত্যাগ করেনি আর সেখানে পৃথিবীর সৃষ্ট সেরা জীব হয়ে অসহায় মানুষের চাল, ডাল, আলু, তেল চুরি করে খাচ্ছে! এটা পৃথিবীর বিবেকবান শ্রেষ্ঠ জীব হয়ে কি করে পারে তা আমার বোধগম্য নয়!

প্লিজ মানুষ, একটু ঘুরে দাঁড়ান, আর অসহায় মানুষের খাবারে ভাগ বসাবেন না! একটু ভাবুন ওরা কত বড় বিপদের মাঝে দিন পার করছে। এক মুঠো খাবারের জন্য ওরা কত হাহাকার করছে। তাদের পাশে আপনারা দাঁড়ান। চুরি করা বন্ধ করুন। যাদের হক তাদের কাছে পৌঁছে দিন। উপরওয়ালা চাইলে আপনাদের কপালে হয়ত এর চাইতে ভাল কিছু রাখতেও পারে। কারণ সরকারের একার পক্ষে এত বড় বিপদ মোকাবেলা করা সম্ভব না। সাধারণ মানুষসহ সমাজপতিদের উচিত এই মহামারীতে সবাইকে আগলে রাখা। তা নাহলে হয়ত বাংলাদেশও ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, চীন দেশের মত মৃত্যু মিছিলে পৌঁছে যাবে। কোন একজন সুস্থ মানুষ কখনো প্রত্যাশা করে না, আমাদের বাংলাদেশের অবস্থাও ঐসব দেশের মত হোক!

নিজেকে বাঁচাতে, নিজের পরিবারকে বাঁচাতে, নিজের দেশকে করোনা ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা করতে সবার উচিত সরকারের আদেশ গুলো মেনে চলা। এবং আমরা যেন তাই করি। আসুন আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই। আমাদের একটু সচেতনতাই পারে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে।

ভাল থেকো বাংলাদেশ, ভাল থেকো বাংলাদেশের মানুষ। নিজে সচেতন হোন এবং অপরকেও সচেতন করুন। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশ করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি পাক।”

হাজং সুমন সরকার, ১৮ এপ্রিল ২০২০

1 মন্তব্য

  1. মহামারীর এই কঠিন সময়ে যে সকল ব‍্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান জনগণের সেবায় নিয়োজিত তাঁদের কাছে সুমনের এই লেখা অত্যন্ত শিক্ষনীয়। সেই সাথে তিঁনি মহামারীর সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে সতর্কও করেছেন। স্বর্গীয় সুমনের প্রতি রইলো অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here