গৌরী সম্প্রদানকালে হিমালয় মেনকাও জামাতা শিবের হাত ধরে বলেছিলেন, ‘কুলিনের পো তোমায় কি বলিব আর, হাঁটু ঢাকি বস্ত্র দিও পেট পুরে ভাত’ কথাটা দেশের বাঙালি হিন্দু-মুসলিম নারীদের বেলায় খাটলেও আদিবাসী নারীদের জন্য হয়ে পড়ে আলগা আলাপ, পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক, বেমানান। কেননা গেল শতক অব্দি বাঙালি হিন্দু মুসলিম নারীদের এমন দুঃসময় গেছে যখন আপন গৃহের চৌহদ্দি পেরোনো তাদের পক্ষে সম্ভবপর হতো না, তখন আদিবাসী সমাজের নারীরা বনের মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় পুরুষের সাথে সমানতালে ঘরে বাইরে সব কাজ করে গেছেন, সমাজ পরিচালনায় রেখে চলেছেন অগ্রণী ভূমিকা। আদিবাসী নারী রাধেঁ, আবার বাধেঁও। ‘এটা নারীর কাজ’ বা ‘ঐটা পুরুষের কাজ’ কিংবা ‘ঘর তুমি সামলাও বাইরেরটা আমি’ এরকম পুরুষালী মেয়েলী কর্ম বিভাজন আদিবাসী সমাজে খুব একটা প্রচলন নেই। ব্যক্তি স্বাধীনতা ভোগ, সামজিক কার্যে পূর্ণ অংশগ্রহনের দিক বিবেচনায় নিসংকোচ নিসংশয়ে বলা যায় আদিবাসী নারী মূলধারার শিক্ষিত অন্য অনেক সমাজের নারীদের থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে আছে, এগিয়ে যাচ্ছে, হয়তো সন্মুখে আরো এগিয়ে যাবে।

কিন্তু এই এগিয়ে গিয়েও পিছিয়ে পড়ে আদিবাসী নারী। সাম্প্রতিক সময়ে নির্মিত হওয়া জাতীয় ইতিহাসে নিম্নবর্গীয় অধস্তন প্রান্তিক সেইসব নারীদের সংগ্রামের কথা স্থান পায়নি, জায়গা দেয়া হয়নি। একমাত্র রাশিমণি হাজং ও কুমুদিনী হাজং-এর কথা ছাড়া হাজংদের বিশেষত হাজং নারী সমাজের কথা বিদ্বৎ মূলধারার ইতিহাসে একদম অনালোচিত। চলতি লেখাটি পিছিয়ে থাকা হাজং আদিবাসী নারীদের সংগ্রাম বিদ্রোহে সক্রিয় ভূমিকা পালনের কথা তুলে ধরার সিকি চেষ্টার প্রতিফলন মাত্র। এখানে উনিশ শতকে ঘটে যাওয়া বৃটিশ ভারতের সর্বশেষ গণ-আন্দোলনে (টঙ্ক আন্দোলন) পুরুষদের পাশাপাশি সাহসী সংগ্রামী হাজং নারীদের কথা আলাদা করে বলার প্রয়োজন বোধ করি।

আলোক সদৃশ সেকেন্ডের মধ্যে ঝট করে ‘হাজং নারী’ বললে মানসপটে পটাপট যে চিত্রটি ভেসে আসে, পাথিন (পায়ের গোড়ালির উপর থেকে বুক পর্যন্ত ঢেকে পড়া কাপড় বিশেষ) পরিধেয় রূপ অথবা জাখা নিয়ে দল বেঁধে মাছ ধরার দৃশ্য, এর বাইরে বাড়তি কোন দৃশ্য চোখে ভাসে না, কিন্তু কেন? কারন সীন্ টা ওভাবেই লেখা, সমাজের পুরুষবাদী ধুরন্ধর পরিচালক মহাশয়েরা চিত্ররূপ ওভাবেই লিখে রেখেছেন। ফলত চিত্রগুলো ওভাবেই চিত্রায়িত হয়, আমরাও সীন্গুলো ওভাবে দেখেই অভ্যস্থ। এইসব চিত্রের বাইরেও হাজং নারীর আরো সামষ্টিক রূপ আছে, যে রৌদ্র তামাট দ্রৌপদী রূপ প্রবল জাতীয়তাবাদী আধিপত্যে তৈরী হওয়া জাতীয় ইতিহাসে কখনো প্রদর্শিত হয়নি, সম্মানের আসন পায়নি, আসতে দেয়া হয়নি সেসব সংগ্রামী ইতিহাস। এককভাবে জাতীয়তাবাদী প্রাবল্যের ঘাঁড়ে দোষ চাপালেই দায় ফুরিয়ে যায়না, আমাদের নিজ জাতি সম্প্রদায়ের অনেক বিজ্ঞ লেখকগণও হাজং নারীর সংগ্রামী ভূমিকার কথা গুরুত্বসহকারে লিখেননি, পাশ কাটিয়ে গেছেন, তা-ও যা লিখিত হয়েছে তা ভূমিকার তুলনায় যৎসামান্য। বরঞ্চ যা লেখা হয়েছে সেই লেখাগুলো পড়ে বোঝা যায়, হাজং নারীর সংগ্রামকে দেখা হয়েছে মুদ্রার একপিঠ থেকে, সংসার ঘরের লক্ষী হিসেবে, মুদ্রার আরেক পিঠের দৃশ্য তাদের চোখে থেকে গেছে যথামতো অদৃশ্য।

যেমন লেখক শ্রী হাজং নিখিল রায় তাঁর ‘হাজং নারী’ শীর্ষক লেখায় হাজং নারীদের বর্ণনা মূল্যায়ন এভাবে করেছেন- ‘হাজং সমাজ পুরুষতান্ত্রিক এবং স্বভাবতই পুরুষ প্রধান। বিয়ের পর হাজং নারীকে স্বামীর ঘরে চলে যেতে হয়। আর তখন থেকেই সে গোত্রান্তরিত হয়ে স্বামীর পরিচয়ে পরিচিতা হয়ে যায়। তার সমস্ত জাগতিক পারলৌকিক ক্রিয়া কান্ড স্বামীর সাথে জড়িত হয়ে যায়। অভিভাবকের দেয়া ভাগ্যকে মেনে নিয়ে সে দাম্পত্য জীবনকে হৃদয়গত অনুভূতি দিয়ে ঐকান্তিকভাবে গ্রহন করে। রক্ষনশীল সমাজ ব্যবস্থায় ঈশ্বর প্রদত্ত পবিত্র প্রেম ভাবী স্বামীর জন্য নৈবেদ্য করে দাম্পত্য জীবনে সে স্বামীর তরে অর্ঘ্য উপহার দেয়।…হাজং নারী স্বামীকে শ্রদ্ধা সহকারে গ্রহণ করে। সকল কাজে নারীগণ এ ব্যাপারে সচেতন থাকে, এমনকি স্বামীর আগে স্ত্রী খাদ্য গ্রহন করে না।’ একই প্রবন্ধে আরো লেখা হয়েছে- স্নানাদি দ্বারা পবিত্র হয়ে নারীগণ রান্না-বান্নায় হাত দেয়। দিনে দু’বার তথা ভোরে সূর্য উঠার আগে গোবর সরা দিয়ে উঠোন বা আঙ্গিনা ঝাঁট দেয়, আবার বিকেলে ঝাঁট দিয়ে পরিচ্ছন্ন করে। সন্ধ্যায় যাবতীয় কাজকর্ম ফেলে রেখে হাত মুখ ধুয়ে পবিত্রভাবে গৃহে এবং মন্দিরে দেবতাকে ধূপারতি দিয়ে প্রণাম নিবেদন করে। ভগবানের কাছে স্বামী সন্তানাদি তথা পারিবারিক মঙ্গল প্রার্থনা জানায়। পারিবারিক দৈনন্দিন দেবার্চ্চণার দায়িত্ব নারীদের দ্বারাই পালিত হয়ে থাকে (খন্ডাংশ)।’ হাজং নারীর এমন গৃহ সরল লক্ষী রূপ মাতম ছাপিয়েও আরো ক্লিওপেট্রা রূপ আছে, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিতে সেইরূপ থেকে গেছে অগোচর। সংগ্রামে সংঘর্ষে বিদ্রোহে হাজং নারীদের অবদান পুরুষের তুলনায় কোন অংশেই কম নয়।

আঠারো শতকের শেষ সময়ে ঘটে যাওয়া হাজং বিদ্রোহে (১৮৯০) হাজং পুরুষদের মতোই নারীর অংশগ্রহণ ছিল  স্বতঃস্ফূর্ত, শৌর্যপূর্ণ। হাজং বিদ্রোহ থেকেও আরো বেশি সংগ্রামী সাহসী সক্রিয় পক্ক ভূমিকা পালনের কথা পরবর্তী উনিশের চল্লিশ দশকে ঘটে যাওয়া টঙ্ক আন্দোলনে দেখতে পাই। টঙ্কের মতো সাম্য রহিত নীতির বিরুদ্ধে নিম্নবিত্ত মুসলমান কৃষক, হাজং পুরুষদের পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বাসকারী হাজং নারীর স্বতঃস্ফূর্ত সক্রিয় অংশগ্রহণ এক অত্যাশ্চর্য বিষয়। টঙ্ক স্থানীয় শব্দ, এর মানে ধান কড়ারী খাজনা। জমি চাষে ধান হোক বা না হোক কৃষক জমিদারকে কড়ায় কন্ডায় বাধ্যতামূলকভাবে ধান দিতো। জমিতে যদি ধান নাও ফলে তবু কৃষককে ধান দিতে হতো, প্রয়োজনে বাজার থেকে কিনে এনেও জমিদারকে ধান দেয়ার বিধান ঈশ্বরীয় আইনের মতো কার্যকর ছিল। টঙ্ক বিধানের দরুণ স্থানীয় কৃষক সমাজ পতিত হয় এক দুর্বিষহ নাজেহাল নারকীয় পরিস্থিতির মধ্যে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের নিমিত্তে কৃষকরা পথ খুজঁতে থাকে। অবশেষে নানান নাটকীয় পরিস্থিতির পর মেহনতী মানুষের ত্রাতা পথ প্রদর্শক হিসেবে কমরেড মণি সিংহ টঙ্ক প্রথা অবসানের লক্ষ্যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন, টঙ্ক আন্দোলনের প্রথম শুরু হয় দশাল ও তার পার্শ্ববর্তী কয়েকটি মুসলমান প্রধান গ্রামে। পরে সেই আন্দোলনের স্ফূলিঙ্গ দাবানলের মতো হাজং অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে হাজং জাতিসত্তার মানুষ আন্দোলনে যুক্ত না হলেও পরের ইতিহাস যুগান্তকারী। পরে টঙ্ক আন্দোলন হয়ে উঠে হাজংদের আন্দোলনে, আন্দোলন যখন জঙ্গী স্তরে গিয়ে পৌঁছায় তখন এককভাবে হাজং কমরেডদের অংশগ্রহণ ছিল সর্বাধিক, মুসলমান কৃষকেরা জঙ্গী আন্দোলনে অংশ নেননি, যদিও মুসলিম এলাকায় টঙ্কের হার ছিল বেশি, তবে তাঁরা আন্দোলনের নির্দেশনা মেনে টঙ্কের ধান কড়ারী দেয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।

  • হাজং মাতা রাশিমণি

সাল ১৯৪৮, ৩১শে  ডিসেম্বর। গারো পাহাড় পাদদেশের সুসং দুর্গাপুরের গাং অপারের বহেরাতলী গ্রাম, এখানে মূলত হাজং ও গারো আদিবাসীদের বসবাস। অন্যান্য দিনের ন্যায় সেদিনও নিয়ম করে সূর্য উঠেছিল, জেগে উঠেছিল বন, বনের পাখি, ফুল, প্রকৃতি। এই দিনেই টঙ্ক আন্দোলনে হাজংদের রক্তে প্রথম স্নাত হয় গারো পাহাড়ের পূণ্যভূমি। সেদিন সুসং দুর্গাপুরের স্থানীয় ক্যাম্প হতে, সশস্ত্র পাঁচজন পুলিশ চার মাইল দূরের গ্রাম বহেরাতলীর হাজং বাড়িতে তল্লাসির উদ্দেশ্যে যায়। সেসময় কোন পুরুষ মানুষ এলাকায় অবস্থান করছিলেন না। তবু হাজং মেয়েরা সাহসের সাথে প্রতিবাদ করে, দা বটি নিয়ে তাদের তাড়া করে। পুলিশেরা হাজং নারীর যুদ্ধাংবেশী রৌদ্রমূর্তি দেখে ভয় পেয়ে পিছপা হয়ে ফিরে আসে। কারণ পুলিশের দল জানতো সংকেত পেলে মুহুর্তের মধ্যে শতশত হাজং পঙ্গপালের মতো ছুটে আসবে। তাঁরা ভয়ে পালিয়ে আসে। পরে ততোধিক পঁচিশ জন পুলিশ ও ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট বেস্টিনকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা পুনরায় বহেরাতলী গ্রামে যায়। তখনও গ্রামে কোন পুরুষ মানুষ ছিলেন না, কাউকে না পেয়ে বেস্টিন বাহিনী কুমুদিনী নামের এক কিশোরী নববধূকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। ততোক্ষনে এই খবর রাষ্ট্র হয়ে যায় যে, বেস্টিন বাহিনী হাজংদের ঘরে ঢুকে ধানের সাথে নারীদেরও লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। এই খবরে রাশিমণি হাজং নামের মধ্যবয়স্কা মহিলা তাঁর নারী বাহিনী নিয়ে অস্ত্র  হাতে (দা, বটি, কোঁচ প্রভৃতি) ছুটে যান কুমুদিনীকে উদ্ধার করতে। জানা যায়, হাজং পুরুষ ভলান্টিয়াররা প্রথমে করণীয় বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাশিমণি হাজং এই সময়েই চিৎকার করে তাঁর ঐতিহাসিক উদ্ধৃতিটির জন্ম দেন। তিনি বলে উঠেন- ‘ময় তিমাট লা ইজ্জাত রক্ষা করিবা না জালে কৈউ যাব? তিমাট লা মর্ম তিমাটই জানে (নারীর সম্মান নারী রক্ষা না করলে কে করবে? নারীর মর্যাদা নারীই জানে)’।

বহেরাতলীর সিমসাং তীরে বেস্টিন বাহিনীকে হাজংরা আক্রমন করে। রাশিমণিদের সাথে বেস্টিন বাহিনীর ধস্তাধস্তি হয়, সংঘাত-সংঘর্ষের এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি চালায়, গুলিতে ঝাঝড়া হয় রাশিমণির বুক। এসময় সুরেন্দ্র হাজং নামের এক ভলান্টিয়ারও গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। মৃত্যুর আগেই রাশিমণি নরপিশাচদের হাত থেকে কুমুদিনীকে ছাড়িয়ে আনতে সক্ষম হন এবং দা দিয়ে কুপিয়ে দুজন পুলিশকে ধরাশায়ী করেন। রাশিমণি হাজং’ই টঙ্ক আন্দোলনের প্রথম শহীদ। পরে তাঁর দেখানো পথে লক্ষ টঙ্ক আন্দোলনের বীর বিপ্লবীরা লাভ করে সংগ্রামের নব অণুপ্রেরণা। কুমুদিনীকে বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করা রাশিমণির আত্বত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে উপাধি দেয়া হয়েছে ‘হাজং মাতা’ নামে এবং শহীদের স্মৃতির চিহ্ন স্বরূপ ২০০৪ সালে বহেরাতলী গ্রামে নির্মিত হয়েছে রাশিমণি স্মৃতিসৌধ। যদিও প্রবীনরা বলে থাকেন, রাশিমণির শহীদ হওয়ার মূল জায়গাটি সিমসাং’র গর্ভে বিলীন হয়েছে। তবুও নির্মিত সৌধ স্বরণ করিয়ে দেয় শহীদের আত্ববলিদানের মহান ইতিহাস।

হাজং মাতা রাশিমণির সংগ্রামী জীবন সম্পর্কে মোটামুটি ভাবে এই কাহিনী টুকুই সর্বজন বিদিত। এর বাইরেও দেখা যায়, রাশিমণির জীবন সংগ্রাম মুখর, জীবনভর সংগ্রাম করে গেছেন তিনি। জীবনের সবটুকু সময়েই তিনি সাধারণ মেহনতী মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নিজ গ্রাম দুর্গাপুরের বগঝড়ায় ‘মহিলা আত্বরক্ষা সমিতি’ সংগঠিত হয়েছিল। যে সংগঠনটি নারীদের পশ্চাৎপদতা কাটিয়ে উঠতে, নারী বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

নিঃসন্তান রাশিমণি হাজং ছিলেন একজন দক্ষ ধাত্রী। ১৯৪৫ সালের মহামন্তরের সময় (বাংলা ১৩৫০) তিনি সাধারণ মানুষের পাশে দাড়িঁয়ে ছিলেন। নিজ প্রচেষ্টায় লঙ্গরখানা খুলে অসহায় মানুষের আহার যুগিয়েছিলেন। এতদসত্ত্বেও অত্রাঞ্চলের নিম্ববর্গীয় মানুষের দ্বারা সংঘটিত হওয়া বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন, আন্দোলনের শহীদদের কথা জাতীয় পরিসরে বরাবর থেকে গেছে অনালোচিত। প্রান্তিক মানুষের বীরত্বপূর্ণ এই ইতিহাসগুলো অদ্যাবধি কখনোই জাতীয় ডিসকোর্সে আনা হয়নি। অধস্তন প্রান্তিক নারীর সংগ্রামের ব্যর্থ প্রয়াস বলে পাশ কাটিয়ে গেছে অধিপতি মহল, শাসকগোষ্ঠী। তা-ও রাশিমণি হাজং’র কথা যা টুকটাক আলোচিত হয় সেটিও প্রবল জাতীয় ইতিহাসের চোটে হারিয়ে যায় জাত্যাভিমানের চোরাবালিতে।

  • ইতিহাস খুঁড়ে বের করা সংগ্রামী হাজং নারী

হাজং মাতা রাশিমণি শ্রেণী চৈতন্যের উপর ভর করে আপন শ্রেণীর বিশেষত নারীদের জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বহু হাজং নারীকে টঙ্ক আন্দোলনে যুক্ত করেন। বিভিন্ন লড়াই সংগ্রামে হাজং নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ অন্তত  আমাদের তাই জানান দেয়। চলুন এখানে রাশিমণিকে ছাপিয়েও অন্যান্য বীর হাজং নারীর বীরত্ব সংগ্রামের কথা ইতিহাস খুঁড়ে তুলে আনতে উদ্যোগী হই, যাঁদের রক্ত ঘাম শ্রম ত্যাগে সংঘটিত হয়েছে টঙ্ক আন্দোলনের মতোন চমক সৃষ্টিকারী বীরত্বপূর্ণ আন্দোলন।

১৯৩৯ সাল, কিশোরগঞ্জে অনুষ্ঠিত হয় ময়মনসিংহ জেলা কৃষক সম্মেলন, এই সম্মেলনে মণি সিংহের নেতৃত্বে প্রায় সত্তর মাইল দূরের পাহাড়ি অঞ্চল হতে শতশত হাজং কৃষক মিছিল নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। তারমধ্যে পুরুষ আর নারীর সংখ্যা ছিল প্রায় সমান সমান। কেবলমাত্র সম্মেলনে যোগদান করার জন্যেই হাজংরা দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে এসেছিলেন। এরমধ্যে কোন কোন হাজং মা প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, তাদের বাচ্চাকে পিঠে বেধেঁ নিয়ে এসেছিল যা সম্মেলনে আগত অন্য সবার জন্য ছিল রীতমত বিস্ময়ের। বাইরের লোকের কাছে এ একটা বিচিত্র দৃশ্য। এরপরেও আমরা দেখি, নেত্রকোনায় যখন নিখিল ভারত কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তখনও হাজং পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ ছিল সংখ্যাধিক্য।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে স্বামী সংসার সমাজ ঘর সামলিয়ে হাজং নারীরা আন্দোলনে যে তৎপর ভূমিকা রেখেছেন তা এক শব্দে অতুলনীয়। হাজং নারীদের সাহস, ত্যাগ, স্পর্ধা, ধৈর্য্য অসামান্য। এমন সাহসের স্বাক্ষর হাজং নারীরা পদে পদে রেখে গেছেন। টঙ্ক আন্দোলন সময়কালীন ঘটিত একটি ঘটনা, ঘটনা ঘটেছে রানীপুর চিরাখালিতে। পাহাড়ের অতি সন্নিকটের গ্রাম। এই গ্রামে একদিন সশস্ত্র পুলিশের দল আসে, এটা দেখে জনা বিশ ভলান্টিয়ারের দল তাঁদের প্রতিরোধ করার জন্য খোলা মাঠে এগিয়ে যায় এবং অপর আরেকটি দল অন্যদিকে তাঁদের আক্রমন করার জন্য অগ্রসর হয়। খোলা মাঠ পেয়ে সশস্ত্র পুলিশ অনবরত গুলি চালাতে থাকে। অপরদিকে ভলান্টিয়ারদের সঙ্গে মাত্র একটি গাদা বন্দুক। কিন্তু ওটার কার্টিজও ফুটলো না। অপর দলও গুলি করতে পারলো না। ফলে সেখানে দুধরাজ, অনন্ত, ক্ষিরোদ প্রমুখসহ সাতজন কমরেড সঙ্গে সঙ্গে শহীদ হলেন। গুরুতরভাবে আহত হলেন দুইজন।

এই ঘটনার সময় কমরেড মণি সিং দূরের এক গ্রামে অবস্থান করছিলেন। ঘটনাশুনে তিনি দ্রুতলয়ে রানীপুর গ্রামে পৌঁছান। তিনি স্বামীহারাদের সাথে দেখা করার জন্য গেলেন, কিছুদূর যেতেই এমন একজন নারীর সাথে তাঁর দেখা হল যে কিনা স্বামী হারিয়েও বিলাপ করছে না। বরং মুখ গম্ভীর। মণি সিংহ তার সাথে কথা বলতে চাইলেন, তিনি কথা বললেন না। সামনে কতগুলি বল্লম ছিল, সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। নারীদের ভাবখানা এই- রক্তের অবশ্যই বদলা নিব। শত্র্রুদের কঠিন আঘাত হানতে হবে। পরে দেখা গেল, তাঁর চোখ হতে জল গড়িয়ে পড়ছে। মণি সিং যাঁদের কাছেই গিয়েছেন, তাদের কেউ-ই উচ্চস্বরে কাঁদেনি। সংঘর্ষের এই ঘটনার পর জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করল যে, যেকোন সময় গ্রামে ফের অতর্কিত হামলা হতে পারে। এজন্য আগেই আহতদের সরিয়ে নেয়া বাঞ্চনীয় বলে নৈতিক সিদ্ধান্ত নিলেও সরিয়ে নেয়া গেল না। কাজেই ঠিক করা হল গাছের উপর পাহারাদার বসানো হবে, রোগীর কাছে কে থাকবে এ নিয়ে মতানৈক্যে পৌঁছানো গেল না। অবশেষে এক বৃদ্ধা হাজং মহিলা বলে উঠলেন, ‘আমি থাকবো। আমার তিন কাল গিয়েছে, আমাকে মেরে ফেলে ফেলুক, আমার মরণে ভয়-ডর নেই’ (টঙ্ক আন্দোলন, মণি সিং)। হাজং নারীদের ভিতরে সাহসের দৃষ্টান্ত এভাবেই প্রতিফলিত হয়েছে।

টঙ্ক আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী নেতা মণি সিং-এর বয়ান অনুযায়ী, ‘টঙ্ক আন্দোলনের সশস্ত্র ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলেছিল প্রায় দেড় বছর। এই সময়ের মধ্যে শতশত কৃষককে জেল জুলুম অত্যাচার চালানো সত্ত্বেও যাঁরা গোপন আশ্রয়ে থেকে সংগ্রাম করেছেন তাঁদের একজনকেও পুলিশ তখন ধরতে পারেনি। একবার তিনজন মহিলা কর্মী অর্শমণি, রাহেলা ও ভদ্র সোমেশ্বরী নদী পার হওয়ার সময় গ্রেফতার হন। পুলিশ ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে এদের উপর নির্মম জঘন্য নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু পুলিশ তাঁদের নিকট থেকে সংগ্রাম সম্বন্ধে কোনো কথা বের করতে পারেনি। পরে তাঁদের ময়মনসিংহ জেলে প্রেরণ করা হয়। সেখান থেকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। তাঁরা দীর্ঘদিন পর মুক্তি পান। জেলে গিয়ে তাঁরা লিখতে পড়তে শিখেন।’

লেখাপড়ার প্রসঙ্গ জেরে টঙ্ক আন্দোলন নিয়ে সত্যেন সেনের একটি কথা উল্লেখ্য। তিনি টঙ্ক আন্দোলন সম্পর্কিত লেখা ময়মনসিংহে হাজং আন্দোলনে লিখেছেন- ‘শিক্ষার দিক দিয়ে হাজংরা অনেক পিছিয়ে ছিলেন, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাঁরা এগিয়ে এসেছিল, তারা এই প্রভাবটাকে তীব্রভাবে অনুভব করতো। এ বিষয়ে তাঁরা ক্রমেই সচেতন হয়ে উঠেছিল যে তাদের এই বৈপ্লবিক আন্দোলনের মধ্যদিয়ে শোষণমুক্ত নতুন সমাজ সৃষ্টি করে তুলতে হলে জনসাধারণকে এবং বিশেষ করে কর্মীদের রাজনৈতিক শিক্ষা লাভ করতেই হবে। অন্ধের পক্ষে সঠিক পথ ধরে চলা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দীক্ষা হচ্ছে কর্মীদের পথে চলার আলো। পার্টিকে জানতে হলে, পার্টির আদর্শ ও কর্মপন্থাকে বুঝতে হলে পার্টি সাহিত্য না পড়লে কি চলবে? এইলক্ষ্য সামনে রেখে পরিণত বয়সের কর্মীদের মধ্যেও অনেকে নতুন করে লেখাপড়া করতে শুরু করেছিল। শুধু পুরুষেরাই নয়, মেয়েরাও। পার্টি সাহিত্য কেনা ও পড়াটা অনেকের কাছেই অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যারা পড়তে পারত, তারাই যে শুধু কিনতো তাই নয়, যারা নিরক্ষর, তাদের মধ্যেও অনেকে কিনতো এই ভেবে যে, বই তাদের সঙ্গে থাকবে এবং যখন সময় ও সুযোগ হবে অন্য কাউকে দিয়ে পড়িয়ে নেবে। নেত্রকোনায় নিখিল ভারত কৃষক সম্মেলনের অধিবেশন সময়কার কথা। আমি বসে বসে আমাদের বই বিক্রি করছি। এক হাজং কৃষক হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল. এই কমরেড বই দে, বই দে। কি কি বই আছে, সব দে। কি খেয়াল হলো, জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই, তুমি পড়তে পারো?

-না, আমি পারি না। আমার পরিবার পড়তে পারে।

প্রশ্ন করে জানলাম, এই বই তার স্ত্রী শুধু নিজেই পড়বে না, তাকেও পড়িয়ে শোনাবে। আর সেজন্য স্বামীত্বের মর্যাদার বিন্দুমাত্র বাধঁবে না। কেন বাধঁবে? তারা যে পরস্পরের কমরেড।’

অতি দীর্ঘ হলেও লেখার চুম্বকীয় অংশ তুলে ধরলাম। এখান থেকে অল্প হলেও আঁচ করা যেতে পারে হাজং নারীদের চরিত্র, সাহস, ধৈর্য্য, দৃঢ়তা আর আত্বত্যাগের কথা। যে কথাগুলো সাম্প্রতিক সময়ে নির্মিত হওয়া জাতীয় ইতিহাসে স্থান পায়নি। এভাবেই ইতিহাস সবার হয়ে উঠার সক্ষমতা হারিয়ে হয়ে পড়েছে পক্ষপাত দুষে দুষ্ট, শ্রেণী সাম্প্রদায়িক, নারী বিদ্বেষী।

লেখক : উন্নয়ন ডি. শিরা, তরুণ প্রবন্ধকার, ই-মেইল: unnayan1432@gmail.com

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here