স্বত্ব দখলীয় ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠায় মধুপুরে আদিবাসীদের বিক্ষোভ। ছবি : সংগৃহীত

জেষ্ঠ্য প্রতিবেদক, জনজাতির কন্ঠ: টাঙ্গাইল মধুপুরের আদিবাসীরা তাদের স্বত্ব দখলীয় জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার আশঙ্কায় ফের রাজপথে নেমেছে। গত সোমবার (২৫ জানুয়ারী), উপজেলার আনারস চত্ত্বরে ১৩টি আদিবাসী সংগঠনের ডাকে সহস্রাধিক আদিবাসী জড়ো হয়েছিল তাদের ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। সেখান থেকে আন্দোলনকারীরা সরকার প্রশাসনকে বিভিন্ন বার্তা দিয়েছেন, জানিয়েছেন দাবি-দাওয়া।

মধুপুরের আদিবাসীদের মাঝে কেন এই উচ্ছেদ আতঙ্ক? নিকট নেপথ্যে দেখা যায়, গত বছরের ২৯ নভেম্বর সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দেশের এক লাখ ৩৮ হাজার ৬১৩ একর সংরক্ষিত বনভূমি উদ্ধারে অভিযানে নামার ঘোষণা দেয়া হয়। সংসদীয় কমিটির তাগাদায় আগামী ৩০ জানুয়ারির মধ্যে দখলদারদের সরে যাওয়ার জন্য চিঠি পাঠানো হবে।

মাঝে গেল ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে সংরক্ষিত বনভূমি দখলদারদের তালিকা তৈরি করে ৩০ জানুয়ারির মধ্যে উচ্ছেদের নোটিশ দিতে বলেছে কমিটি। সংরক্ষিত বনভূমির বাইরে যেসব বনের জমি দখলে রয়েছে তার তালিকা আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে দিতে মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে।

সংসদীয় কমিটির কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে বিভিন্ন শ্রেণির মোট বনভূমির পরিমাণ ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার ৭০০ একর। এর মধ্যে দুই লাখ ৮৭ হাজার ৪৫২ একর বনভূমি দখলে আছে। দেশের বনভূমি ৮৮ হাজার ২১৫ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের দখলে আছে।

সভাশেষে কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, “আমাদের মূল লক্ষ্য জমি উদ্ধার। এই যে সংরক্ষিত বন দখল করে রেখেছে এটা গেজেটভুক্ত। এখানে দখলদার আদালতে গিয়েও কিছু করতে পারবে না। বিভিন্ন ক্যাটাগরির বনের জমি দখল হয়ে আছে। আগে সংরক্ষিত বনের জমি উদ্ধারে মন্ত্রণালয়কে হাত দিতে বলা হয়েছে। এটা শুরু হলে অন্য দখলদাররা সতর্ক হয়ে যাবে।“

সংরক্ষিত বনভূমির অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে বিশেষ অভিযান পরিচালনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গত ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে নেয় এ সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, কক্সবাজার বন বিভাগের অবৈধ দখলকৃত সংরক্ষিত বন উদ্ধারে অভিযান চালানো হবে। পরবর্তী সময়ে দেশের অবশিষ্ট অঞ্চলের অবৈধ বনভূমি থেকে দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।

বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান। ছবি : ফেইসবুক

বনভূমি অবৈধ দখলে আছে এমন ১২টি জেলার জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত এ বিশেষ অভিযান মনিটরিং ও সমন্বয় করার জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ও উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত এসকল অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের সহায়তা কামনা করা হয়েছে।

সরকারের এমন অভিযানের সিদ্ধান্তে আতঙ্ক ছড়িয়েছে মধুপুরের আদিবাসী জনমনে। কেন এই আতঙ্ক? আদিবাসীরা কি বনভূমি জোরজবর দখলকারী?

এ প্রসঙ্গেই বর্ষীয়ান আদিবাসী রাজনীতিক অজয় মৃ বলেন, “মধুপুর বনাঞ্চলে আদিবাসীরা বন বিভাগ, বন আইন তৈরীর আগে থেকেই বসবাস করে আসছে। যার প্রমাণ ভুটিয়ার প্রাইমারী স্কুল ও বেরীবাইদের প্রাইমারী স্কুল। ১৯১৫ সালে ভুটিয়ার স্কুল নির্মাণ হয়। কিন্তু আদিবাসীরা কখনোই জমির কাগজ করার প্রয়োজনবোধ করেনি। আজকে বন বিভাগ বনবাসীদের উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।“

মধুপুরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বন বিভাগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাস্তবে তারা বন ধ্বংস করে আদিবাসীদের উপর দোষ চাপিয়েছে। যেটা অন্যায়। আদিবাসীরা বন ধ্বংস করে না বরং রক্ষা করে জোর গলায় বলেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মি. মৃ।

জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক বলেন, আইএলও কনভেনশন বা আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে আদিবাসীদের জমির কাগজ থাকুক বা না থাকুক সেই স্বত্ব দখলীয় জমির অধিকার আদিবাসীদের।

১৯৭২ সালে আইএলও কনভেনশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনুস্বাক্ষর করেছেন। কাজেই আইন অনুসারে আদিবাসীরা যে জমিতে থাকেন সেই জমি তাদের। আদিবাসীদের বনভূমি থেকে উচ্ছেদের পায়তাঁরা আন্তর্জাতিক আইন বিরুদ্ধ সিদ্ধান্ত বলেও মনে করেন এই আদিবাসী নেতা।

এদিকে সংরক্ষিত বনভূমির নামে আদিবাসী উচ্ছেদ আতঙ্কের অবসান না করলে আগামী দিনে কঠোর আন্দোলনে নামার হুশিয়ারি দিয়েছেন আদিবাসী নেতারা। আন্দোলনকারীরা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আগামী ৩১ জানুয়ারী জলছত্র মাঠে মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here