সোমেশ্বরী নদী। গারো ভাষায় যাকে বলা হয় সিমসাং। গারোদের নিজস্ব লোককথায়, গানে, কবিতায়, সাহিত্যে কখনো জ্যোৎস্নার রাতে প্রেমিকার এলোচুলের খোঁপার মত এসেছে কখনো অভিমানি সৌন্দর্য হয়ে এসেছে। কিন্তু আজকের এই আলোচনায় সিমসাং যতোনা সৌন্দর্যের বিস্তৃত প্রতীক তার থেকে বেশি নিদারুণ যন্ত্রণা হয়ে নেমে এসেছে তীরবর্তী গইড়াতলি, কামারখালী, বড়ইকান্দী গারো গ্রামগুলোতে। এ মৌসুমে বর্ষার শুরুর দিকেই নদীর পাড় ভাঙা শুরু হলে গারো গ্রামগুলো এক বসত ভিটা হারানোর দুঃশ্চিন্তায় পড়তে শুরু করে।

আমরা ছুটে যাই ভাঙনের মুখে দাঁড়ানো গ্রামগুলোতে, গিয়ে বিলীনপথের গারো গ্রাম এবং গারো জনগোষ্ঠীর যন্ত্রণা আমাদেরকেও নিদারুণ এক যন্ত্রণায় ছটফটময় পরিস্থিতিতে ফেলে। গ্রাম ঘুরে কথা বলে উঠে আসে গ্রামগুলোর বক্তব্য যেখানে কামারখালি গ্রামে এক মাসি বলেন, এ নিয়ে দুইবার হলো নিজের এবং অনেকের ভিটে সরিয়ে সরিয়ে আজকের এই পর্যায়। পিছনে যেতে যেতে এই ভিটে শেষ জায়গা, অথচ এই ভিটের উঠোনের অর্ধেক এই মৌসুমের বর্ষায় চলে গিয়েছে নদীগর্ভে।

আরেক গারো নারী বক্তব্যে জানান, উনারা ঠিক শেষ মুহুর্তে দাঁড়িয়ে আছেন যদি এই ভাঙন না ঠেকানো যায় তাহলে কামারখালী গ্রাম দেশের মানচিত্র থেকে মুছে যাবে সাথে গ্রামের প্রায় ৪০-৫০টি গারো পরিবার হবেন বসত ভিটে ছাড়া। যাদের অনেকে নিজেরে জীবনে শেষ সঞ্চয় দিয়ে গড়ে তুলেছেন বাড়ি।

এই সিমসাং নদীর ভাঙন কি এ বছরেই বেশি? নাকি আরো আগে থেকেই ভাঙছে এ প্রশ্ন খুঁজতে ছুটে যাই এক আম্বির কাছে যিনি এই গ্রামে বিয়ের পর এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সময়ে কথা বলে জানা যায় সেই সত্তরের দশকের নদী ভাঙন আর ২০২০ সালের নদী ভাঙনের রয়েছে তুমুল পার্থক্য। তিনি তার দীর্ঘজীবনে এমন ভাবে নদী ভাঙন দেখেননি।

তাহলে প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় এমন রুপবতী সিমসাং হঠাৎ এতো হিংস্রতায় রুপ নিলো কিভাবে? কেন? ভাবতে ভাবতেই একদল যুবক বৃদ্ধ গ্রামবাসী নৌকা নিয়ে ছুটছে নদীর মাঝখানে, বিকট শব্দে কয়েকশো বালু তুলার ড্রেজার মেশিন বন্ধ করতে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল গত কয়েক দশক ধরে চলছে সোমেশ্বরী নদীতে এমন বালু উত্তোলনের মহাযজ্ঞ। যেখানে নৌকা গুলো সীমা অতিক্রম করে গ্রামের কাছাকাছি চলে আসে এসব ড্রেজার মেশিন নিয়ে। যার ফলে গ্রামের তীরবর্তী পাড়গুলোতে মাটির সক্ষমতা হারিয়ে অল্প স্রোতে ভেঙে পড়ছে।

এতসব ভাঙনের আয়োজনে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের কাঠামো কি ভাবছে তা নিয়েও কিছু খন্ডচিত্রের খোঁজ মেলে। গারো সংগঠনগুলো এলাকাবাসীকে নিয়ে এ বিষয়ে আন্দোলনের পথে হাটলে জেলা প্রশাসক পরিদর্শনে আসেন ২০ আগস্ট, প্রতিশ্রুতি দেন স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে এবং এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, ডিসি ২৫ লক্ষ টাকার প্রকল্প গ্রহণের কথা জানান। ২৩ আগস্ট উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে প্রাথমিক কাজ চালু করেন কিন্তু মাত্র তিনটা বালুর বস্তা নদীর পাড়ে ফেলা হয় পরবর্তীতে বিক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী ৫০০ বস্তা জোর করে আটকে নিজেরা নদীর পাড় গুলোতে দিয়ে ভাঙন আটকানোর চেষ্টা করেন। অথচ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ভাঙনরোধের প্রকল্প হতে পারতো বাংলাদেশের নিপীড়িত বঞ্চিত গারো জনগোষ্ঠীর গ্রাম রক্ষার রক্ষাকবচ।

আমরা যদি ইতিহাসের দিকে পর্যালোচনার দৃষ্টিতে তাকাই দেখা মিলবে এই রাষ্ট্রের এমন অনেক টেকনিক নিয়ে এসেছে যা এসব জনগোষ্ঠীর বিলীনের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত বাঙালিদের সেটেল করা, ভোট ব্যাংক তৈরি করা, বাঙাকিকরণের পথে গারো জনগোষ্ঠর গ্রামগুলোকে ফেলে দেওয়া। ঠিক একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে সিমসাং নদীর তীরবর্তী গারো গ্রামগুলো।

লেখক: প্রত্যয় নাফাক, সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, জনজাতির কন্ঠ।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here