তখন রাত ১টা বেজে ঠিক ১ মিনিট। চেয়ারে ঠেস দিয়ে নিবিষ্ট চিত্তে তরুণ কবি বন্ধু নিগূঢ় ম্রংয়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বহিঃপ্রকাশ’ পড়ছিলাম। বোঝার চেষ্টা করছিলাম কবিতা গুলোর সারাংশ। বলা বাহুল্য, কবিতা গুলো বুঝতে আমার বিন্দুমাত্র কষ্ট হয়নি বরং এক একটি কবিতা পড়া শেষে মনে হয়েছে, আরে এটা তো আমারই লেখার কথা ছিল! এমনটি হবারই কথা; কারণ কবির নিত্য চলাফেরার ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে আমিও একজন। তাঁর চিত্রকল্প, লেখার বিষয়বস্তুর সাথে আমার আছে পূর্ব পরিচয়। তাই হয়তো কবিতাগুলো বুঝতে অতোটা বেগ পেতে হয়নি।

কবির কবিতা এরআগেও বিভিন্ন জায়গায় বিছিন্নভাবে পড়েছি। এখানে একত্রে সব কবিতা মলাটবদ্ধ হয়েছে; হীরের পুঁতি এক সুতোয় গাঁথলে যেমন সুন্দর দেখায় তেমনি অপরূপ দেখাচ্ছে কবিতা গুলোকে। গত ১৪ই ফেব্রুয়ারী, গারো বইমেলায় বইটি পাঠক মহলে এসেই তৈরী করেছে আলোড়ন। অতুৎসাহী পাঠক ফেইসবুকে কবিতার লাইন লিখে শেয়ার করছেন অনুভূতি। একজন লেখিয়ের জন্য এরথেকে প্রাপ্তি আর কিইবা থাকতে পারে!

তবে কাব্যগ্রন্থখানা পাঠে প্রথম পাঠক মাত্রই ভড়কে যাবেন। বলবেন প্রচলিত প্রেম-নারী, প্রকৃতির মাঝে কবি আটকে গেছেন। প্রচলতি রীতি থেকে বেরোতে পারেননি। এই কালিমাও লাগতে পারে যে কবি প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়ে ব্যর্থ আস্ফালন করেছেন পাতায় পাতায়। নমুনা দেখুন-

‘মনের গভীরে ভাঙা কাঁচের শব্দ

টুকরো টুকরোতে পরিণত।

কাঁচ ভাঙে

ভাঙে কাঁচ,

কাঁদে মন

মন কাঁদে আজ

ভয় হয়, ভাঙা কাঁচে

অবেলায় যদি আবার কাটে। (ভয়)’’

বত্রিশ পাতার কাব্যগ্রন্থে এরকম অনেক কবিতা আছে যেগুলো আসলে ব্যর্থ প্রেমিকের গীত বললেও অতুক্তি হবে না। এই গীতগুলোর মধ্যেও কিন্তু নিজস্ব ঢং আছে, আছে নিজ গারো সমাজের চিত্র। যেমন- ‘‘খোঁপায় বুনোফুল/ লাল টকটকে দকমান্দা পরা উদাসী ঢঙে হেঁটে যাচ্ছে (অদ্ভূত নেশা)’’।

ইদানিংকার গারো তরুণের স্বপ্নের রাজকন্যার (ড্রিম গার্ল) রূপকল্পে কেমন রমণীর চিত্র আসে? সাদা চামড়ার স্লিম, উচুঁ নাক, লম্বাটে মুখশ্রী, বাদামী কেশরী রমণী? এ প্রশ্ন যাচাইয়ে হ্যাঁ বাচক উত্তর বেশি আসবে বোধকরি। কেননা দীপিকা পাডুকোন, এমা ওয়াটসন, শাকিরা, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, ব্রিটনি স্পিয়ার্স যখন ক্রাশের তালিকায় তখন নাক চ্যাপ্টা, বেটে রমণী কল্পনায় আসবে? এখানে কবির বেলা ঘটেছে ব্যতিক্রম। গারো সম্প্রদায়ের এই কবি স্কিন টাইট হাল্কা খোলামেলা পোশাক পড়া ঢঙ্গী রমণীর প্রেমে নন বরং পড়তে চান দকমান্দা পরিহিতা গারো নারীর প্রেমে। দকমান্দা পড়া গারো রমণী উদাসী ঢঙে কবির পাশ দিয়ে হেঁটে যায়, ধরিয়ে যায় নেশা; অন্তরে। কবি এ নেশায় বুদ হয়ে থাকতে চান।

কিন্তু পারেন না! কারণ কবি যেমন প্রেম প্রত্যাশী অমন প্রেমের প্রেমিকা পান না। জোটে না। এ যুগের প্রেমিকারা গোলাপ ফুল চায়, চায় না জঙলার বুনোফুল। কবি তাঁর কাঙ্ক্ষিত প্রেমিকার খোঁপায় গেঁথে দিতে চান বুনোফুল; পাহাড়ের শোভাময়ী বুনোফুল খোঁপায় নিতে অনাগ্রহ কেন গারো আদিবাসী রমণীর?

মেহনতী নিচু তলার মানুষের জীবনে দুঃখ-কষ্ট শরীরের চামড়ার মতোই নিত্যসঙ্গী। এই দুঃখকে সঙ্গী করেই জীবন সাগর পাড়ি দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এই লাইনে- ‘‘আমার একটা তেজপাতা রঙের শার্ট চাই/ বিষাদ গায়ে লেপ্টে রাখি/ অথবা- ধূসর রঙের একটি টি-শার্ট চাই/ মলিনতাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচি। (বিষাদ)’’

চারপাশের প্রেমের অজস্র নিত্য চিত্র কবি ‘বহিঃপ্রকাশ’ নাম কবিতায় তুলে এনেছেন। রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যান কিংবা সংসদ ভবনের সামনে কপোত-কপোতী প্রেম নিবেদন, খোশগল্প করেন; লাল কৃষ্ণচূড়াকে সাক্ষী রেখে এখানে কত রাঙা স্বপ্ন বুনা হয়, যুগলের স্বপ্নচারিনী রাঙা স্বপ্নে কত চ্যালেঞ্জ আসে, সেখানে সেইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেয়া হয় ‘‘ছেড়ে যাবো না, এ হাত সরবে না’’ ফিরতি বার্তা। এই কবিতায় যে কেউ নিজেকে আবিস্কার করবেন।

এইসব প্রেমকাব্য পাঠে যখন পাঠক মগ্ন তখনি কবি আসল গল্প (যা তিনি বলতে চান) বলা শুরু করে দেন। এই রাষ্ট্রে আদিবাসী প্রান্তিক মানুষ প্রতিনিয়ত শোষণ, বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও রাষ্ট্র প্যাকেজে আদিবাসী উঠান বেচে, বেচে জমি, জঙ্গল, জলাধার। ইকোপার্ক, ইকো-কটেজ, ইকো-ট্যুরিজম, সামাজিক বনায়ন, সংরক্ষিত এলাকা ইত্যাদির নামে আদিবাসী জমি বেহাত হয়। ফলে আদিবাসীরা হয় নিজভূমে পরবাসী। পরবাসী শৃঙ্খলিত জীবন থেকে মুক্তির প্রত্যাশা- ‘‘পাহাড় ঝর্ণা, সবুজ বন, আদিবাসী/ বেঁচে থাক, বাঁচতে দে/ জীববৈচিত্র্য আর আমার ভূমি/ আমার উঠান/ মুক্তি দে। (রাষ্ট্র প্যাকেজে আমার উঠান বেচে)’’

দুই ফর্মার বইয়ে প্রেম, সমাজ জীবনের বিষাদ, তিক্ততা, গারো সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, অধিকারবোধ প্রকাশিত হয়েছে দারুণভাবে। রাখঢাক ভণিতা না করে কবি সমাজ জীবনের অতি জটিল বিষয়গুলো প্রাঞ্জল ভাষায় প্রকাশের মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন। বলা চলে প্রেম-চেতনার সার্থক ‘বহিঃপ্রকাশ’ ঘটেছে কাব্যগ্রন্থটিতে।

উন্নয়ন ডি. শিরা: তরুণ লেখক।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here