মেয়ে মেগা তজুর সঙ্গে পিরিলিস। ছবি : নিজস্ব

উন্নয়ন ডি. শিরা: ‘আজ থেকে ৫ বছর আগে যখন নিজে ছোটেখাটো পার্লার খুলে ব্যবসা শুরু করি তখন এর নাম দিয়েছিলাম ‘আদিবাসী বিউটি পার্লার এন্ড ট্রেনিং সেন্টার’। কিন্তু নাম সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেক বাঙালি কাস্টমার পার্লারে সেবা নিতে আসতো না! পরে বিষয়টি বুঝতে পেরে পার্লারের নাম বদলে মেয়ের নামে রাখি ‘মেগা বিউটি পার্লার’। এখন বাঙালি-আদিবাসী সব মহিলাই সেবা নিতে আসে।’

বলছিলেন পিরিলিস আগাতা তজু নামের এক বিউটিশিয়ান। প্রান্তিক গারো আদিবাসী সম্প্রদায়ের সংগ্রামী এই নারী একাধারে বিউটিশিয়ান, উদ্যোক্তা এবং পার্লার মালিক। স্বল্প শিক্ষিত পিরিলিস ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন অন্যের অধীনে না থেকে স্বাধীনভাবে নিজে কিছু করার। অদম্য সেই ইচ্ছাই তাকে পার্লার মালিক বানিয়ে তুলে। তবে এই পথ অতো সহজ হয়নি, তাকে হাঁটতে হয়েছে দীর্ঘ পথ।

রাজধানীর মিরপুর-২ বড়বাগ এলাকার থানার পিছনে পিরিলিসের পার্লার। সেখানে তিনি ছাড়াও আরও দুজন নারী কর্মী কাজ করেন। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ফলে তিন মাস পার্লার বন্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে। তিনিও খুলছেন। কিন্তু আগের থেকে কাস্টমার অনেক কম। যার ফলে অফিস টিকিয়ে রাখা হয়ে পড়ছে কঠিন। তিন মাসের অফিস ভাড়া বকেয়া পড়ে আছে। বকেয়া মেটানো, কর্মীদের বেতন ভাতা প্রদান, ছেলে মেয়ের পড়াশোনার খরচ সর্বোপরি সংসারের প্রয়োজনীয় জোগান আসে পার্লার থেকেই। তাই পার্লার খুলতেই হবে, অন্য কোনো দ্বিতীয় পথ নেই।

-মেগা বিউটি পার্লার

পিরিলিসের দুই সন্তান। এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলে পড়ছে নবম শ্রেণীতে আর মেয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে। স্বামী-দুই সন্তান নিয়ে থাকেন মিরপুরের কাজীপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায়। করোনাভাইরাসের কঠিন সময়েও পিরিলিস ঢাকা ছাড়েনি কারণ ঢাকাত্যাগ মানে অনিশ্চিত ভবিষতের দিকে পা বাড়ানো। জেনে বুঝে কেউ কি আর অন্ধকারাছন্ন সামনের দিকে পা বাড়ায়! তা-ই মাটি কামড়ে ঢাকা শহরে পড়ে থাকা। এই ‘ঢাকা শহর’ কতশত মানুষকে শক্ত পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে, স্বাবলম্বী করে তুলেছে। স্বল্প শিক্ষিত পিরিলিসকেও ঢাকা অকৃপণভাবে সাহায্য করেছে- এটি সে অস্বীকার করে না।

আজ থেকে বছর বিশ আগে যখন পিরিলিস ঢাকা শহরে আসে তখন সে ছিল এক নবীন বিউটিশিয়ান। যে কিনা পার্লারের কোনো কিছুই জানে না, কোনো কিছুই পারে না! মিরপুরের সুয়াং (বর্তমানে নাম পরিবর্তিত) পার্লারে সে কাজ শিখে, তখন বেতন ছিল নামে মাত্র। দীর্ঘদিন সেই পার্লারে কাজ করে হাত পাকা করে নেয় সে। পেরিয়ে যায় চৌদ্দ-পনেরো বছর। সময়ের হিসেবে হয়তো বেশি নয় কিন্তু কাজের হিসেবে অনেক সময়। এই সময়ে তাঁর স্বামী-ঘর সংসার, ছেলে মেয়ে হয়েছে। কিন্তু রয়ে গেছে পিরিলিসের সোনালি স্বপ্ন। যতনে পুষে রাখা সেই স্বপ্ন স্বামী পঙ্কজ ডি. শিরার সহায়তায় ও নিজের সঞ্চয়ী অর্থ দিয়ে ২০১৫ সাল নাগাদ নিজেই শুরু করলেন পার্লার ব্যবসা। নাম দেন ‘আদিবাসী বিউটি পার্লার এন্ড ট্রেনিং সেন্টার’। কিন্তু বিধিবাম! কাস্টমার টানতে পারেন না। কাস্টমার না থাকার কারণটি সুয়াং পার্লারের নিয়মিত পরিচিত এক সেবা গ্রহীতার মাধ্যমে জানতে পারেন। ঐ সেবা গ্রহীতা বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম পার্লারটি কেবল আদিবাসীদের জন্যে, তা-ই পার্লারে আসি না’। এই ঘটনার পর পার্লারের নাম পরিবর্তন করেন। নাম পরিবর্তন বেশ কাজে দেয়।

গল্পের মতো পিরিলিসের পার্লার হয়তো ভালোভাবেই চলতে পারতো কিন্তু মাঝে বাঁধ সাধলো অনাকাঙ্ক্ষিত করোনাভাইরাস। এরফলে ছবির মতো সবকিছু স্থবির হয়ে পড়ে আছে। ব্যবসা বন্ধ থাকায় বড় অর্থনৈতিক ধসের মুখোমুখি ক্ষুদ্র পার্লার ব্যবসায়ী পিরিলিস। এই ধস কীভাবে কাটিয়ে উঠবেন পিরিলিসের জানা নেই।

সম্প্রতি সরকার বিউটিফিকেশন খাতকে শিল্পের মর্যাদা স্বীকৃতি দিয়েছে, যা এই পেশা সংশ্লিষ্ট সবার মনে আশার সঞ্চার করেছে। স্বীকৃতিদানের মধ্য দিয়ে সরকারি-বেসরকারি নানা খাত থেকে পার্লার ব্যবসায়ীরা সহযোগিতা পেতে পারেন, দেশের ৫০টি বড় বড় পার্লার মালিকদের সংগঠন আছে, তাঁরা সাংগঠনিকভাবে সহযোগিতা নিতে পারেন। কিন্তু পিরিলিসের মতো বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পার্লার ব্যবসায়ীরা কীভাবে সরকারি প্রণোদনা সহযোগিতা পাবেন?

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here