করোনাকালীন সময়েও নারীর উপর নিপীড়ন নির্যাতন থেমে নেই। বরং বেড়েছে আগের তুলনায়। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এখন বাংলাদেশে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এই তথ্য রীতিমতো আতঙ্ক উদ্বেগের সঞ্চার করে। একটি সভ্য স্বাভাবিক দেশে এমন রীতি চলতে পারে না।

ধর্ষণ একটি সামাজিক ব্যাধি। প্রাণঘাতী করোনা থেকেও বাংলাদেশের মানুষ এখন ধর্ষণ নামক ভয়াবহ ব্যাধিকে ভয় পায়। যে মাত্রায় নারীর উপর সর্বত্র সহিংসতা দেখা যাচ্ছে, এর কী কোন শেষ নেই? বিষয়টি নিয়ে গত ৭ অক্টোবর, রাত ৮.৩০ ঘটিকায় জনজাতির কন্ঠ ‘নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, শেষ কোথায়?’ শিরোনামে এক ওয়েবিনারের আয়োজন করে। এতে বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ইলিরা দেওয়ান, আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব চঞ্চনা চাকমা, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ রহমান অংশ নেন। ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন জনজাতির কন্ঠ’র সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য প্রত্যয় নাফাক। আলোচনার সারাংশ তুলে এনেছেন উন্নয়ন ডি. শিরা।

  • চঞ্চনা চাকমা, সদস্য সচিব, আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক

পাহাড়ের আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করছে। কিন্তু সেই সংগ্রামকে বাধাগ্রস্থ করার জন্য নারীদের উপর নিপীড়ন-ধর্ষণ করা হয়। পাহাড়ের আদিবাসীদের অস্তিত্ব বিলুপ্তির জন্য এথনিক ক্লিনজিং ডেমোগ্রাফির যে তৎপরতা তারই অংশ হিসেবে পাহাড়ি নারীদের ধর্ষণ-নিপীড়ন করা হয়। বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলের ধর্ষণের ঘটনা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়নের ঘটনায় তফাৎ আছে। পাহাড়ে ভূমি দখলের জন্যও আদিবাসী নারী ধর্ষণের শিকার হন। আজকের পার্বত্য চট্টগ্রামের মনোরম সাজেক, নীলগিরী, নীলাচলে রয়েছে আদিবাসী বিশেষত পাহাড়ি নারীদের কান্না।

কিছুদিন আগে খাগড়াছড়ির বলপেয়ে আদামে যে প্রতিবন্ধী আদিবাসী নারী গণধর্ষণের শিকার হন তখন ধর্ষিতার মা বারবার বলছিলেন, ‘আমার মেয়ে তো বাকপ্রতিবন্ধী, তাঁর চিন্তাশক্তি নাই। তাকে কেন? তাকে ছেড়ে দিন। বরং আমাকে করুন।’ এই ঘটনায় ৯ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু এই ধর্ষকেরা কি বিচারের সম্মুখিন হবে? আমার পূর্ব তিক্ত অভিজ্ঞতা বলে হবে না।

বাংলাদেশে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি চলছে এজন্যেই ধর্ষকেরা পার পেয়ে যান। আগস্ট মাসে খাগড়াছড়িতে ঘটিত মারমা কিশোরীর ধর্ষণের ঘটনায় সালিশ বসানো হল। সালিশে ধর্ষককে পার পাইয়ে দেয়ার চেষ্টা চালানো হল। বলা বাহুল্য, সালিশী বৈঠকে ধর্ষণের মতো অপরাধের কোন মীমাংসা হয় না। এখানে আদালতে স্বরণাপন্ন হতেই হবে। ধর্ষণের মতো ঘটনার সামাজিক মীমাংসা বা সালিশী সুরাহা করার চেষ্টা করা অপরাধ।

ইদানিংকালে আদিবাসী নারীরা কেবল ধর্ষণের শিকার হন না তাঁরা ইসলামীকরণেরও শিকার হচ্ছেন। এটা আগেও ছিল, কিন্তু বর্তমানে নতুন মাত্রা পেয়েছে। বান্দরবানের ম্রো, মারমা, ত্রিপুরা মেয়েদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে ফোর্স করা হচ্ছে। এটা নারী নিপীড়নের একটা অংশ।

আমি মনে করি, নারী নিপীড়নের যে মাত্রা যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে তা কমাতে হলে নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে কঠোর আইন এবং আইনের প্রয়োগ দরকার।

  • ইলিরা দেওয়ান, মানবাধিকার কর্মী

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয়েছে। এ নিয়ে আমরা গৌরব-অহংকার করি। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও যে দেশের জনগণকে ধর্ষণের মতো অপরাধের বিচারের জন্য রাজপথে নামতে হয় সেখানে কিসের গৌরব, কিসের অহংকার? আমরা অতীব দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছি, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর, সদ্য স্বাধীন দেশ, দেশের অবাঙালি জাতিসত্তাসমূহকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়। এমন স্বাধীনতা তো আমরা চাইনি।

পাহাড়ে নারী নিপীড়নের যে ধারা চলমান তাতে কল্পনা চাকমা অপহরণের পর নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। সেই সময় সেখানকার নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা কল্পনা চাকমা অপহৃত হন। কিন্তু তার কোন সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচার আমরা পাইনি। তদন্তের রিপোর্ট এগোয়নি। এরপর অনেক পাহাড়ি নারী কল্পনার চাকমার মতো নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। ২৪ বছর বয়সে কল্পনা চাকমা হারিয়ে গেছেন। আজ ২৪ বছর পরও কেন তাঁর অপহরণের বিচার হবে না?

পাহাড়ে বছরের পর বছর ধরে জাতিগত, নারী নিপীড়ন চলছে। কিন্তু এই নিপীড়নের সব খবর মিডিয়ায় আসে না। পাহাড়ের ঢালে সেই খবর হারিয়ে যায়। নোয়াখালীর নারী নিপীড়নের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। কিন্তু এরআগে কেন কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি?

একটা জাতিকে মানসিকভাবে নিপীড়ন করার অন্যতম অস্ত্র হল সেই জনগোষ্ঠীর নারীর উপর নিপীড়ন চালানো। জাতির মানসিক মনোবল দুর্বল করার জন্য নারীর উপর নিপীড়ন চালানো হয়। যেটা পার্বত্য চট্টগামে করা হচ্ছে।

যখন জাতীয় নারী নীতিমালা প্রণীত হয় তখন আমরা অনেক বেশি উচ্ছসিত ছিলাম কিন্তু পরবর্তীতে ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেছি। সেখানে (জাতীয় নারী নীতিমালায়) আদিবাসী নারীদের কথা সুস্পষ্টভাবে কোন কিছু লেখা নেই। আদিবাসী নারীরা কাগজে কলমেও অধিকারহীন।

এখন আমরা করোনার থেকে ধর্ষণকে বেশি ভয় পাচ্ছি। যার ফলে সামাজিক দূরত্ব উপেক্ষা করে আন্দোলনে নামছি। যদিও আরও বেশি সক্রিয় হওয়া দরকার ছিল। যে সীমাবদ্ধতা আছে তা কাটানো প্রয়োজন এবং ধর্ষণে দায়ের করা মামলায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি করা দরকার।

  • আরিফ রহমান, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট

নারীর উপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে বর্তমানে সারাদেশে একটা আন্দোলন চলছে। এই আন্দোলনে আমি নিজেও একজন সক্রিয় কর্মী। নোয়াখালীর সেই নারীর উপর পৈশাচিক কায়দায় নিপীড়ন চালানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই সারাদেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। ঢাকার শাহবাগে যখন প্রগতিশীল ছাত্র-যুব নেতৃবৃন্দ ধর্ষণের বিরুদ্ধ কালো পতাকা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন তখন পুলিশ আন্দোলনকারীদের উপর হামলা চালায়। প্রায় ৭-৮ জনের মতো আন্দোলনকারী আহত হন। ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে এমন হামলার শিকার হওয়া কোন মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। নিন্দনীয়।

বাংলাদেশে এখন প্রতিদিন প্রায় ৩-৪টা ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। আইন ও শালিস  কেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, আজ থেকে বিগত ২৫ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ৪০ হাজার ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে আইনের আওতায় এসেছে কতজন? ২০০১ থেকে ২০১৫ সালের ২২ হাজার ধর্ষণের রিপোর্টের বিপরীতে মাত্র ৫ হাজার মামলা হয়েছে। এই মামলাগুলোর মধ্যে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৮০০টির রায় হয়েছে। অঙ্ক কষলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ধর্ষণের মতো অপরাধের বিচার ০.৪৫ শতাংশের হয়েছে। ধর্ষণের বিচারের অবস্থা যদি এমন হয় তবে ধর্ষণ অপরাধের মাত্রা বাড়াটা স্বাভাবিক নয় কী?

ধর্ষণ বাংলাদেশে অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। পাহাড় সমতল সর্বত্র ধর্ষণকাণ্ড ঘটছে। শিশু, কিশোরী, নারী, বয়স্কা কেউ বাদ যাচ্ছে না। এরমধ্যে পাহাড়ি নারীরা জাতিগত নিধনের পাশাপাশি নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। যা মিডিয়ার বাইরে থেকে যায়। পাহাড়ে নিপীড়নের যে আলামত এগুলো স্পষ্ট গণহত্যার আলামত। গণহত্যাকেই সেটি নির্দেশ করে। সেই আলামতগুলো মূলধারায় আসে না, আসতে দেয়া হয় না কিংবা আসতে আসতেই বাতাসে দ্রবীভূত হয়ে যায়।

যে বিষয়টি বলে শেষ করবো, ধর্ষণের সাথে জৈবিক চাহিদার সম্পর্ক খুব অল্প। এখানে ক্ষমতার সম্পর্ক থাকে বেশি। অপরাধীরা ক্ষমতার আশেপাশে থাকে এবং ক্ষমতাকে পরখ করে দেখবার জন্য অনেক সময় ধর্ষণের মতো অপরাধের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। এখন যদি ধর্ষণের বিরুদ্ধে বড় ধরণের গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা না যায়, আইন সংস্কার করা না যায় তবে এই সংকট আরও গভীরে পরিণত হবে। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে ধর্ষণ ইস্যুতে রাষ্ট্রীয় আইন সংস্কার প্রয়োজন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here