কমরেড রনিলা বনোয়ারী

উনিশ শতকের দিকে গারো পাহাড়ের পাদদেশে প্রগতিশীল কমিউনিস্ট বামধারার অগ্রযাত্রী  হিসেবে কমরেড রনিলা বনোয়ারী  এক অনন্য নাম। যিনি আজীবন একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন। আমি উনার একজন তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে, উনি আমার চোখে কেমন ছিলেন চলুন দেখে নেওয়া যাক।

আমি যখন ছোট ছিলাম তখনকার সময়ের টঙ্ক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, হাজং বিদ্রোহ, গারো বিদ্রোহ সম্পর্কে শুনে আসছি। সবকিছু আমার কাছে পুরান কাহিনী কিংবা রামায়ণের গল্পের মতোই শোনাতো। আমি যখন বয়সের একটা পর্যায়ে এসে পৌঁছলাম, তখন দেখা গেল সমাজে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি এখনো। জানলাম, লড়াই -সংগ্রামটা একদিনের ব্যাপার নয়। একমাত্র আমাদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মাধ্যমেই পরিবর্তনের হাওয়া আসা সম্ভব। আমাদের  পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমাদেরই লড়াই জারি করে রেখে যেতে হবে। আমাদের সকলেরই একটি রিভ্যুলুশন বা বিপ্লব দরকার। তো চলুন আগে দেখে নেই, টঙ্ক আন্দোলন মানে কি?

টঙ্ক আন্দোলন মূলত জমিদারদের প্রথা থেকে আগত। তখনকার দিনে জমিদাররা কৃষকদের জমি থেকে ধান হোক বা না হোক জোরজবরদস্তি করে ধান অথবা জমি কেড়ে নিয়ে খাজনা আদায় করেই ছাড়তো। এতে জমিদাররা লাভবান থেকে আরও লাভবান হতো এবং এই রঙ্গ বঙ্গদেশের হতদরিদ্র কৃষকেরা আরও দারিদ্রসীমার নিচে চলে যেতো। আর এই জঘন্য জমিদারপ্রথার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম লড়াই করেন জমিদার ভাগ্নে কমরেড মনি সিংহ। যিনি তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। যিনি উনার জীবনের দীর্ঘসময় মেহনতি মানুষের পক্ষে লড়াই করেছিলেন এবং বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। বৃটিশদের বিরুদ্ধে কন্ঠ তোলার জন্য তিনি দীর্ঘ জীবন কারাবাসে ছিলেন৷ কমরেড রনিলা বনোয়ারীর বাবা বাহাদুর স্নাল ছিলেন একজন বামপন্থী নেতা। সেই সুবাদে কমরেড মনি সিংহ, ললিত সরকার, ভরত জাম্বিল, মৃণাল বিশ্বাসসহ অনেকেই রনিলা বনোয়ারীর বাড়িতে আসতেন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মিটিং, আলোচনা, বৈঠক করতেন। আর এভাবেই কমরেড রনিলা বনোয়ারী প্রগতিশীল মনোভাব নিয়ে একটি তারুণ্য দীপ্ত সময় পার করে এসেছিলেন। বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে টঙ্ক মিছিলে প্রায় সময় যোগ দিতেন।

আমি আমার ছেলেবেলা থেকে আমার পনেরোতম বসন্ত পর্যন্ত উনাকে দেখেছি, উনার বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর আমার কানে এখনোও বাজে। যিনি আজীবন খেটে খাওয়া, গরীব, মেহনতি মানুষের পক্ষে লড়াই করে গেছেন। এমন কেউ নেই যিনিরা উনার কাছে এসে খালি হাতে ফিরে গেছেন। শোষণমুক্ত একটি সমাজের স্বপ্ন তিনি আমাদের চোখে বুনে গেছেন। উনার একটাই মূলমন্ত্র ছিলো, “কেউ পাবে তো কেউ পাবেনা, তা হবে না, তা হবে না।’’ আমাদের নলছাপ্রায় উনার মতো চৌকষ, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, প্রখর মেধা সম্পন্ন কাউকে দেখিনি। তিনি অন্যায়কে কখনোও প্রশ্রয় দিতেন না। ছোটবেলায় দেখতাম, এলাকার নবী হোসেন, জয়নাল মামাদের নিয়ে এলাকার কৃষকদের সুবিধা অসুবিধার কথা বলে মিটিং করতেন। তখনকার স্থানীয় এমপি গোলাম রাব্বানীকেও দৃঢ় কন্ঠে অভিযোগ করতেন। বিভিন্ন মিটিং মিছিলে আমাকেও নিয়ে যেতেন। আমি তখন বুঝতাম না খুব একটা। কিন্তু একটা ব্যাপারেই জানতাম, তিনি মানুষের জন্য কিছু করতে চলেছেন। এ ব্যাপারটা আমাকে খুব অণুপ্রাণিত করতো। ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন ও আদিবাসী ইউনিয়নের মিটিং এ আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতেন।  সবার মাঝে জয়ধ্বনি, ‘একতা’ পত্রিকা তিনি নিজেও পড়তেন ও অন্যকেও পড়তে উদ্বুদ্ধ করতেন।

যখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি, তখন আমার প্রশ্ন ছিলো, “আবু (গারো ভাষায় নানী/দাদীকে আবু বলা হয়), হিন্দু ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম ও মুসলিম ধর্ম আছে, সবাই নিজেদের ধর্মকেই সেরা মনে করে, কিন্তু মানবধর্ম নেই কেনো?’’ আমার প্রশ্নে তিনি যে অবাক হননি উনার কপাল না কুঁচকানো দেখে আমি আরও অবাক হয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, “আগে তুমি মানুষ হও তারপর মানব ধর্ম হবে!’’ তিনি ঈশ্বর  বিশ্বাস করতেন না, ধর্ম বলতে কেবল মানব ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন।  একথা আমি অনেক পরে জেনেছি।

বামপন্থী মনোভাব ও সত্য বলার কারণে  এলাকায় তিনি পাতিনেতাদের  ক্ষোভের কারণ হয়েছিলেন।  কিন্তু কেউ সাহস করে রনিলা বনোয়ারীর সামনে এগিয়ে আসতেন না।  উনি সারাজীবন ন্যায়ের পথে কাজ করে গেছেন। পেশায় তিনি ছিলেন একজন শিক্ষিকা। উনার জীবন দর্শনে তিনি একটি আলোকিত জাতি গড়ার কাজ করে গেছেন। একসময় বয়সের ভারে তিনি প্যারালাইসিস হয়ে দীর্ঘজীবন ভুগেছিলেন। তারপরও তিনি উনার বাসায় মিটিং আলোচনা সভা করতেন কলমাকান্দা-দূর্গাপুরের নেতাদের নিয়ে। এ অঞ্চলের জনগণের সমস্যার কথা বলতেন। সিপিবির নেতৃবৃন্দদের সাথে বৈঠকে বসতেন। দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস, প্যারালাইসিসে ভোগে পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলে, অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে মহীয়সী এই নারীর ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারিতে জীবনাবসান ঘটে।

লেখক: অনন্যা বনোয়ারী, কমরেড রনিলা বনোয়ারীর নাতনি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here