উন্নয়ন ডি শিরা
-লেখক

কাঁচা বাজারের এক দোকান থেকেই কিছু সবজি, মাছের বাজার থেকে তিন কেজি রুই, মুদি দোকান থেকে ভিমবার আর দু’ডজন ডিম নিয়ে ঝটপট রিক্সায় উঠে সেংমান। বাইরে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। পুলিশী নিষেধাজ্ঞা আছে, আছে নিজেরও জানের ভয়। পরিস্থিতি দেখে মনে হবে যেন সর্বাত্মক যুদ্ধ চলছে, যেকোন মুহূর্তে শত্রু চলে আসতে পারে; তাই বাড়তি সতর্কতা, তাড়াহুড়া।

লকডাউনে কত দ্রুত বাজার সাড়তে হয়! মিনিট বিশ কি পচিঁশের মধ্যেই বাজার করা সাড়া। শুধু জরুরি অবস্থা বলেই নয়, অন্য স্বাভাবিক সময়েও বাজার করতে অতো সময় লাগে না সেংমানের। বাজারে গিয়ে যা নেওয়ার নিয়ে নেয়া, এতে দেরি হওয়ার কি আছে? অথচ শৈশবে বাবার বাজার আনতে কত সময় লাগতো, লেগে যেতো অর্ধেক দিন! সেই দিনগুলোর কথা মনে হলেই সে আনমনা দুঃখী হয়ে উঠে।

গারো পাহাড় পাদদেশের প্রকৃতিঘেরা রামখঞ্জুরা গ্রামে সেংমানের বাড়ি। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে সে কনিষ্ঠ। বাড়ি থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরত্বের কর্ণঝোড়া বাজার। সোম-বুধবার হাটবার। গারোদের জন্যই এই বাজার জমজমাট থাকে। গারোরা এখানে দলবেঁধে সদাইপাতি, বড়দিনের বাজার করে। এই হাঁটেই দুপুর বেলা বগলে কাপড়ের থলে নিয়ে বাবা, জেঠা দুই ভায়রা মিলে বাজারে যেতো। দুপুর বেলা হেঁটে শুরু হতো তাদের বাজার যাত্রা। ফিরতো সন্ধ্যা সাতটা কি আটটায়। ততোক্ষণে বাড়ির ছোটরা না খেয়েই চলে যেতো ঘুমের রাজ্যে। বাড়িতে মা ভাত রেধেঁ রাখতো। বাবা ফিরলে হতো তরকারি রান্না।

বাবা বাজার থেকে ছোটদের জন্য নিয়ম করে গজা, বুলবুলি, জিলাপি, পিঁয়াজু কখনোবা বাদাম, বুট নিয়ে আসতো। ছোটরা এসবের জন্যই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা, রাস্তার দিকে রাখতো সজাগ দৃষ্টি। বাজার থেকে বাবা চলে আসলেই এগিয়ে নিয়ে ব্যাগ খোলা শুরু করবে! কিন্তু বাবা আসতো না। অপেক্ষার সেই সময়গুলোতে দিদি প্রায়শই ‘এই বাবা চলে আসছে’ বলে মজা নিতো। এমনি মজা অভিমানে ঘুমিয়ে পড়তাম।

পরের দিন সকালে উঠেই রেখে দেয়া স্ন্যাকস্ মুখ না ধুয়ে খাওয়া শুরু করি। গালাগাল উপদেশ শোনার সময় কোথায়। উল্টা ‘আমার জন্য অল্প রাখা হয়েছে’ বলে গুরুতর অভিযোগ উঠাতাম। বাজার থেকে কার বাবা কি এনেছে, এসব দেখিয়ে দেখিয়ে খাওয়ায় চলতো প্রতিযোগিতা। সেইসব দিনগুলোর কথা মনে এলে নিজেকে হারিয়ে ফেলি।

ঢাকায় বসে হারানো সেইসব স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে বাবার বাজার থেকে দেরি করে ফেরার কারণ স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ছে। বাজারে যাবার সময় বাবা কখনোই নগদ টাকা নিয়ে যেতে পারতো না। থাকলে তো নিবে! খুব কম সময়েই সে হ্যান্ডক্যাশ, তা-ও বড়জোর একশো কি দেড়শো টাকা নিয়ে যেতে পারতো। এই টাকা দিয়েই সে বাজার করতো, নিতো পাইকার কিংবা মহাকজনদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা; সেই টাকায় করতো সাধ্যের বাজার। বাজারের মাঝেই অল্পকিছু টাকা বাঁচিয়ে আমাদের জন্য গজা, চানাচুর, জিলাপি, পিয়াজু, বুলবুলি, বাদাম কিংবা ফেবারিট বুট নিয়ে বাবা ফিরতো পায়ে হেঁটে!

লেখক: উন্নয়ন ডি. শিরা।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here