ইয়াংঙান ম্রো

‘‘আমাদের স্বর্গের ন্যায় গ্রাম থেকে হঠাৎ করে কেন আমাদের অন্য জায়গায় চলে যেতে হয়েছে? কী আমাদের অপরাধ?’’

‘‘আমাদের মা-বাবা আর ভাই-বোনদের আত্মা যে মাটির সাথে মিশে আছে আমরাও সেই মাটিতে মরতে চাই।’’

কথাটা আমার নয়, চিম্বুক পাহাড়ের সন্তান অন্ধ কাইরিং ম্রোর। যে মাটিতে আমার মা-বাবা আর ভাইবোনেরা মারা গেছে সেই মাটিতে আমিও মরতে চাই। আমার দাদা-দাদী আর মা-বাবা নানা বিপদ আর ভয়কে উপেক্ষা করে চিম্বুক পাহাড়কে বাসযোগ্য করে তুলেছিল, আজ আমাদের কেন অন্য জায়গায় চলে যেতে হয়েছে। আমাদের কী অপরাধ ছিল? এটি চিম্বুকে অবস্থিত রামরি পাড়ার আশি বছরের বৃদ্ধা অন্ধ কাইরিং ম্রোর প্রশ্ন। তিনি এই কঠিন প্রশ্ন আমাদের সবার জন্য রেখে দিয়ে চিরকালের জন্য চলে গেলেন। ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০৭ সালে। তখন বান্দরবান জেলা সদর উপজেলায় অবস্থিত টংকাবতী আর সুয়ালক ইউনিয়নে গ্রামগুলো একে একে উচ্ছেদ হয়ে গ্রামের মানুষ অজানার পথে পা বাড়িয়েছিল। তেমনি রামরি কাইরিং ম্রোর অন্যদের মত এতটা ভাগ্য ভাল ছিল না। তাকেও আশি বছরের শরীর নিয়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে হয়েছিল। এখানেই শেষ নয়, অন্ধ বলে তিনি চোখেও দেখতেন না। তাই তাকে ঝুড়ির ভিতরে রেখে নিয়ে যেতে হয়েছিল। একজন সচেতন মানুষের নিজভুমিতে পরবাসী হয়ে কি রকম অনূভুতি হয় তা অন্ধ কাইরিং ম্রো থেকে জানতে পারা যায়। তবে অন্ধ কাইরিং ম্রোর আর্তনাদ আর ভূমিকে নিজের প্রাণের চেয়ে ভাল লাগার কথাগুলো শুনতে চাইলে আমাদেরকে আরো একটু পিছনে যেতে হবে।

আমার বন্ধু মেনচ্যং আজ কোন কথা বলছে না। প্রেনপং আর মেনয়া মাঝে মাঝে তার সাথে দুষ্টামি করে। কিন্তু আজকাল বর মেনচ্যং ভদ্র হয়ে থাকে। হাসি-মস্করা করলেও তেমন হাসে না। গোসল সেরে আমরা নিজেদের ঘর থেকে কলা পাতা মোচা দিয়ে ভাত খাই মেনচ্যংদের ঘরে। কয়েকজন যুবক তরকারী সার্ভিস করছে। আর বাকিরা যে যে স্থানে বসে ভাত খাওয়ার জন্য বসে আসে। সময়ে সবাই এক সাথে ভাত খেলাম। আমরা অনেক আনন্দের সাথে ভাত খেলাম। কারণ মেনচ্যং কিন্তু শুধু শুকর জবাই করেনি। গরুও জবাই করেছে। ফলে বিয়ের মেলা আরো বেশি জমে উঠে।

ভাত খাওয়ার শুরু হতে না হতে ওয়াইজংশন ক্যাম্প থেকে একদল লোক এসে আমাদের গ্রামের মেম্বারকে খুঁজতে লাগলো। মেম্বার সেখানে গেলে তারা আমাদের গ্রামের নিচে চলে গেলো। তারা চলে আসায় আমাদের বিয়ের আনন্দ মুহুর্ত সব ধুলিসাৎ হয়ে গেল। পরে আমি জানতে পারলাম আমাদের গ্রামের পাশে ফায়ারিং এলাকা করার জন্য তারা জায়গা মাপতে এসেছেন। খাবার শেষ করে আমিও মেম্বারদের সাথে যোগ দিলাম। তারা ফিতা বের করে জায়গা মাপতে থাকেন। আর বলতে থাকেন যাদের জায়গা বা ঘর ফিতা মাপের মধ্যে পড়েছে তাদেরকে এক সপ্তাহের মধ্যে অন্য জায়গায় চলে যেতে হবে। শুনে আমাদের গ্রামের মানুষসহ অন্যান্য গ্রামের লোকদের মন খুব খারাপ হলো। আমি তাদেরকে বললাম, মাত্র এক সপ্তাহ কিভাবে আমরা অন্য জায়গায় চলে যেতে পারবো। পরে আমার কথায় এক মাস সময় দেওয়া হল। তারা চলে গেলে আমাদের গ্রামের লোকজন হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। তারা বলতে থাকে, আমরা কোন জায়গা, কিভাবে নিজের ভিটামাটি ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যাবো। বয়স্করা আমাকে বললো, বাবা ইয়াংঙান তুমি তাদেরকে ভাল করে বুঝিয়ে বলো যে, আমরা নিজভূমি ছেড়ে কোথাও যেতে পারবো না। আমাদের স্বামী, মা-বাবা যে মাটিতে মারা গেছে আমরাও সে মাটিতে মারা যেতে চাই। তারা কেঁদে কেঁদে আমাকে এসব কথা বললো। তখন আমারও কান্না চলে এল। তারা আরো বললো, আমরা এই মাটিকে বাসযোগ্য করে তুলেছিলাম। আমরা যখন এখানে আসি তখন এখানে বন্য জন্তু আর গাছপালা বাদে আর কোন কিছুই ছিল না। তবে আজকে কেন আমাদেরকে নিজভূমি থেকে চিরকালের জন্য চলে যেতে হবে।

তারা বলতে থাকে, ইয়াংঙান তুমি তাদেরকে বলবে যদি চলে যাওয়া ছাড়া তাদের চলে না, তবে আমাদেরকে মেরে ফেলতে। তবুও আমরা অন্য জায়গায় চলে যেতে পারবো না। তাদের কথায় আমার কান্না চলে আসে। আমাদের এলাকায় জায়গা মাপ দেওয়ার পর থেকে এলাকার মানুষের মধ্যে এক অনিশ্চিত জীবনযাপন, আতঙ্ক আর হতাশা দেখা দিতে থাকে।

এর কয়েকদিন পর আমি আমাদের পাশের গ্রাম রামরিপাড়াতে গেলাম। সেখানে আমার বড় দিদি সংলেং এর বিয়ে হয়েছিল অনেক বছর আগে। রামরিপাড়ার লোকদের সাথে আমাদের গ্রামের মানুষদের অনেক সখ্যতা ছিল। প্রায় সময় আমরা তাদের গ্রামে ফুটবল খেলতে যেতাম। তারাও আমাদের গ্রামে খেলতে আসতো। তাদের গ্রামে প্রায় সময় রিনা (কলেরা) হত। তখন আমাদের গ্রামের মানুষ তাদেরকে আশ্রয় দিতো। রামরিপাড়ার লোকদের ভাগ্যও এতটা ভাল ছিল না। তাদের গ্রামও উচ্ছেদ হয়ে গেল। তাই এক পলকে আমার দিদি সংলেংকে দেখতে গেলাম। তারা কোন জায়গায় চলে যাবে তা জানার জন্য। তারা দূরে চলে গেলে হয়তো তাদের সাথে বাকি জীবনে আর দেখা হবে না। রামরি পাড়া গিয়ে আমার কষ্টের ভার আরো বেড়ে গেল। আর কষ্টের ভার হল আমার মায়ের বান্ধবী কাইরিং ম্রোকে নিয়ে। তিনি আজ অনেক বছর ধরে অন্ধত্ব জীবনযাপন করছিলেন। আমি তাদের ঘরে গেলে তিনি আমার কথা বুঝতে পেরে আমার কাছে হামাগুড়ি দিয়ে চলে আসলেন।

আমার পাশে বসে কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, বাবা ইয়াংঙান আমরাতো এই গ্রামে যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছি, তবে আজ কেন আমাদেরকে অন্য জায়গায় চলে যেতে হচ্ছে। কি আমাদের অপরাধ ছিল যার জন্য আমাদেরকে চলে যেতে হচ্ছে। সেদিন ছিল তাদের গ্রামের মানুষদের অন্যত্র চলে যাওয়ার শেষ দিন। অনেকে ইতিমধ্যে চলে গেছে। তার ছেলেরা তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ডাকতে লাগলো। কিন্তু কাইরিং কিছুতেই যেতে রাজি হল না।

তিনি বললেন, যে গ্রামে আমার স্বামী, আমার মা-বাবা মারা গেছে সেই গ্রামে আমিও মরতে চাই। তোমরা সবাই চলে যাও, আমি একা এখানে থেকে যাবো। আমি একা এখানে না খেয়ে মরে যাবো তবু নিজভূমি থেকে কোথাও যাবো না। তাঁর কথায় আমার চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু ঝরল। আমাকে তাদের অতীতের নানা সুখ-দুঃখের কাহিনী শোনালেন। কিন্তু সেদিন ছিল তাদের চলে যাওয়ার শেষ দিন। তাই যেকোন ভাবে সেদিন তাদেরকে অন্য জায়গায় চলে যেতে হবে। পরে তাঁর ছেলেরা তাকে থ্রোং (ঝুড়ি) এর ভিতরে রেখে দিলেন। কারণ অন্ধ বলে তিনি হাঁটতে পারতেন না। তাই তাকে থ্রোং এ করে নিয়ে যেতে হয়েছিল। পরে তাকে থ্রোং এ করে একজন নিয়ে গেল।

কেঁদে কেঁদে তিনি বললেন, আমাকে আমার মা-বাবার কাছ থেকে দূরে রেখো না। যে গ্রাম আমার কাছে স্বর্গের মত পবিত্র, সেই গ্রাম থেকে আমাকে দূরে রেখো না। আমাকে আমার স্বর্গের মত গ্রাম থেকে দূরে রাখলে আমি বাঁচতে পারবো না। কিন্তু তাঁর কথা কেউ শোনেনি। এক সময় তাঁর কন্ঠ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণ হয়ে মিলিয়ে গেল।

একে একে আমার দিদিরাও চলে গেলেন। কেবল আমি একা তাদের গ্রামে পড়ে থাকলাম। অতীতের কথা মনে পড়তেই আমি একা একা কাঁদলাম। দিদির যখন এই গ্রামে বিয়ে হয়েছিল তখন আমি আর আমার মা প্রায় সময় তাদের গ্রামে যেতাম। কোন কোন সময় দুই-তিন দিন পর্যন্ত থাকতাম। আমরা তখন রামরিপাড়ার ছেলেদের সাথে অনেক খেলতাম। ঝিরিতে মাছ ধরতাম। নাগেশ্বরে ফুল তুলতে যেতাম। জালতা গাছে উঠে বানরের মত হৈ-হুল্লা করতাম। কত আনন্দ, কত সুখ ছিল তখন। আর এখন? আমি একা পড়ে রয়েছি তাদের গ্রামে। নাগেশ্বর গাছটি এখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে। পরে আমিও চলে গেলাম আমাদের গ্রামে।

আমাদের জীবন কত সুন্দর ছিল। ফুলের বাগানের মত সাজানো ছিল আমাদের জীবন। কিন্তু সব কেড়ে নিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে আমাদের সুন্দর ভবিষ্যত। সহজ-সরল, ভূমির পুত্র আদিবাসীদের জীবনে এই ধরনের দুর্যোগ কেন? নিজভূমি থেকে উচ্ছেদ করে বর্তমানে আমাদের আর কোন কিছুই বাকি নেই। আজ আমাদের এলাকার মানুষের সমস্ত জায়গা কেড়ে নেওয়ায় আমরা বড়ই অসহায়। আজ আমরা নিজভূমে পরবাসী জীবনযাপন করছি। বর্তমানে আমরা নিজেদের ভূমিতে জুমচাষ করতে চাইলে প্রতি বছর অনেক পরিমাণ টাকা দিয়ে তবে চাষবাস করতে হয়। এটা কি নিজভূমে পরবাসী জীবন নয়?

সাতং পাড়া, ডেবা পাড়া, দেওয়াই হেডম্যান, সাখয় পাড়া, আশোর পাড়া,বাইট্যা পাড়া, রাংলাই পাড়া, ক্রামাদি পাড়া, বসন্ত পাড়া, রেনিংক্ষ্যং বাগান পাড়াসহ আরো অনেক গ্রামের মানুষ উচ্ছেদ হয়ে তাদের জায়গা হারিয়েছিল। আমি আমার এই লেখা শ্রদ্ধেয় কাইরিং ম্রোকে উৎসর্গ করলাম।

আমার লেখা তখনি স্বার্থক হবে যখন আমরা আমাদের ভূমিকে মায়ের সমান ভালবাসবো। জন্মদাতা মা আর ভূমি রক্ষার জন্য আন্দোলন, প্রতিবাদ করতে পারবো। পূর্বপুরুষদের গড়ে তোলা স্বর্গের মত গ্রামকে ভালবেসে তার জন্য আপন প্রাণ বির্সজন করতে বিন্দুমাত্রই কুন্ঠাবোধ করবো না। ভূমি দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর আন্দোলন করতে পারবো।

কাইরিং ম্রো একজন নিরক্ষর হলেও জন্মভূমির প্রতি তাঁর যে টান, ভালবাসা তা ছিল খুবই তীব্র। আমাদের যুব সমাজ কাইরিং ম্রোর থেকে অনেক শিক্ষা নিতে পারে। আমি আমার এই লেখাটি শ্রদ্ধেয় কাইরিং ম্রো এবং যারা ভূমিকে মাতার সমান ভালবাসেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আর ভালবাসা জানিয়ে আমার লেখা ইতি টানছি।

(‘নির্মল আকাশে হঠাৎ কালো মেঘের ছায়া’ লেখা থেকে)

লেখক: ইয়াংঙান ম্রো, লেখক ও গবেষক।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here