সমাপন স্নাল
গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত শিল্পী সমাপন স্নাল। ছবি : ফেইসবুক।

বিনোদন ডেস্ক, জনজাতির কন্ঠ: গান গেয়ে জীবন পার করে দেওয়ার সাহস খুব কম গারো তরুণেরই আছে; কারণ আমাদের দেশের কন্ট্রাডিক্টে গান গেয়ে জীবন চালানো যায় না, চালানো হয়তো যায় খুব কষ্টে। এক্ষেত্রে হাতড়ালে তবুও ব্যতিক্রমী কয়েকজনকে পেয়ে যাই, যারা গানে মজেছেন; গান গেয়ে জীবনকে যাপন করছেন। এই কয়েকজনের মধ্যে একজন সমাপন স্নাল।

নেত্রকোনা কলমাকান্দার পাঁচগাও গ্রামে প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে উঠা এই শিল্পী ছোটকাল থেকেই গান করেন। গানের জন্য ছেড়েছেন সবকিছু। কিশোর বয়সে পরিবারের সাথে মুলামুলি হলে অভিমানে জঙ্গল ভিসায় পাড়ি জমিয়েছিলেন পার্শ্ববর্তী ভারতের মেঘালয় রাজ্যে। রাজ্যের বরসরা টিনপুরে প্রথমদিকে কয়লা খনিতে মুহুরির কাজ করলেও শেষ অব্দি লেবার হিসেবে ঠেলেছেন কয়লার ট্রলি। এক ট্রলি ঠেলে পেতেন ২০ টাকা। আড়াই ফিটের সুড়ঙ্গে ট্রলি ঠেলে দৈনিক পেতেন দুইশো থেকে তিনশো টাকা। সে এক কঠিন ঝুঁকিপূর্ণ জীবন। যেকোন সময় দুর্ঘটনা ঘটে জীবন প্রদীপ নিভে যেতে পারে। সেই জীবন ছেড়ে আবার দেশে ফিরেন।

দেশে ফিরে প্রায় দশ বছর (২০০৮-২০১৮) বিরিশিরি কালচারাল একাডেমির স্টাফ শিল্পী হিসেবে কাজ করেন। এছাড়াও ছিলেন সালগিত্তাল প্রোগ্রামের নিয়মিত শিল্পী (২০০৯-২০১৪)। বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন বাংলার শৈল সমতল ও বিটিভির পঞ্চাশ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে গেয়েছেন গান।

একাডেমির স্টাফ শিল্পী থাকাকালে তাঁর দুটি অ্যালবাম বের হয়। একটি ‘জুমাংনি রাণী’ (একক) ও অন্যটি রুমঝুম বিজয়া রিছিলের সাথে ‘থেংসুয়া আসকি’ নামের ডুয়েট অ্যালবাম। বর্তমানে সমাপনের হাতে অনেক গান আছে। যেগুলো আছে রিলিজের অপেক্ষায়।

উঠতি গারো শিল্পীদের মৌলিক গানের প্রয়োজন পড়লেই তাঁর কাছে কল আসে। দিনদিন আরো নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠছেন। প্রথম নারী ব্যান্ড দল এফ মাইনরের বহুল জনপ্রিয় পরাণ প্রিয় গানের গারো ভাষার অংশের কৃতিত্বের তিনি অন্যতম অংশী। সম্প্রতি রিলিজ পাওয়া চৈতি মানখিনের ‘নামনিকে’, নেমসি মৃ’র ‘রিমরিকনা’, ‘রাণী’ শিরোনামের গানের গীতিকার, সুরকারও তিনি। প্রকৃতিতে জলবায়ুর বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে গারো ভাষায় নির্মিত ‘থুপায়েংজক চিরিং চিমা’, ‘একাত্তর চেতনার স্বদেশে’, ‘আনচিং আচিক জাত’, রেংআং গিমিন সালরাংখো (একাত্তর অবলম্বনে) ইত্যাদির মতো অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় মৌলিক গানে কন্ঠ দিয়েছেন।

গান পাগল এই তরুণ রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত নিজের বাসাকে বানিয়ে ফেলেছেন মিউজিক স্টুডিওতে। বাসায় বসেই তিনি গানের কাজ করেন। আরেক হার্থট্রব সলো সিঙ্গার টগর দ্রংয়ের সাথে দ্বৈত অ্যালবাম বের করবেন। সেটির কাজ চলছে। অ্যালবামটি বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের কথা মাথায় রেখে করা হচ্ছে বলে জানালেন সমাপন নিজেই।

গানের তালিম কার কাছ থেকে নিয়েছেন এমন প্রশ্নে রীতিমতো হেসে উঠলেন। স্মিত হেসে বললেন, অনেকজনের কাছ থেকেই নিয়েছি। কৈশোরে থাংসেক ব্যান্ডের ভোকাল ওস্তাদ পল্লব স্নালের কাছে গান শিখার জন্য পাঁচগাও থেকে কান্দাপাড়া বরুয়াকোনায় (সাত কিলো দূরত্ব) হেঁটে চলে আসতাম। মাঝেমধ্যে চল্লিশ টাকায় সাইকেল ভাড়া করে নিতাম; টাকা না থাকলে হেটেঁ আসতাম। তাঁর কাছেই গানের হাতেখড়ি।

পরে কলমাকান্দায় ওস্তাদ গিরিন্দ্র সরকারের কাছে শিখেছি। বাড়ি থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরত্বের পথ কখনো সাইকেলে, ট্রলারে বা হেটেঁ এসেছি। শেখা থামাইনি। নিজে খ্রিস্টান হলেও পড়শী বকুল হাজংদের কির্তন নিবিষ্ট চিত্তে দেখে থাকতাম কেবলমাত্র বাদ্য বাজানো শিখার জন্য। তিনি আমাকে কিভাবে বাদ্য বাজাতে হয় তা শিখিয়ে দেন। এমনই আরেকজন সুদর্শন স্কু। তিনি যাত্রাপালায় হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতেন। চাকলা হাগিদকের কাছে টাঠরাক, নজরুল গীতি, লক্ষণ গীত, ছোট ছোট বন্দিশ শিখেছি। আধুনিক গানের তালিম নিয়েছি জিপ্ত মৃ’র কাছে।

একাডেমিতে ঢোকার পর গান লেখা ও সুর করার উৎসাহ জুগিয়েছেন মালা আরেং। তাছাড়া সান্তনা রাংসা, নবারুণ থিগিদী, দীপক রাংসার কাছে ব্যক্তিগতভাবে গানের কলাকৌশল শিখেছি। সুমার্সন মাজির কাছে শিখেছি তবলা বাজানো। ঠোটের এক কোণে রহস্যের হাসি হেসে বললেন, এখনো শিখেই চলেছি।

এ পর্যন্ত গাওয়া গানের সেরা কোনটি এমন ধাঁচের প্রশ্নে বলেন, নিজের সেরা গান এখনো রিলিজ করা হয়নি। আপকামিং অ্যালবামে সেরা গানগুলো নিয়ে আসছি।

ব্যক্তিগত জীবনে খুবই সাদামাটা জীবনযাপন করেন। চলছেন কিভাবে জিজ্ঞেস করতেই জনজাতির কন্ঠ’র এই প্রতিবেদককে সরল মনে বললেন, টিউশনি কনসার্ট করি। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির মিউজিকের কাজ করে দিই। চলতে তো হবে।

সমাপন এগিয়ে যেতে চান। সেই লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে চলেছেন। নিজের জনগোষ্ঠীর সুহৃদজন তাকে সাধ্যমতো করে যাচ্ছেন সাহায্য সহযোগিতা। সবার সহযোগিতায় তিনি এগিয়ে যেতে চান। গারো জাতিসত্তার সঙ্গীতকে নিয়ে যেতে চান এক অন্য মাত্রায়।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here