হাতিরঝিলে যে সুশ্রী মান্দি মেয়ে দুটির সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল ধরে নিলাম তাঁদের একজনের নাম তন্বী সাংমা আরেকজনের সেংবিয়া মারাক। তাঁদের দুজনের বাড়িই ময়মনসিংহ গারো পাহাড়ের অখ্যাত কোন মান্দি গ্রামে। বয়স পড়াশুনার হিসেবে আমার থেকে পাঁচ ক্লাস জুনিয়র হলেও কি হবে দায়িত্ববোধের দিক থেকে ওরা অনেক পরিণত। তাঁরা দুজনেই ছোট বেলার বান্ধবী। সম্পর্কে মামাতো বোন, সারীর সম্পর্ক দুজনার। সদা হাসি খুশি স্বভাবের এই দুই সারীদ্বয়ের সাথেই সেদিন গোধূলি বেলায় শহরের হাতিরঝিলে কিছুক্ষনের জন্য হেঁটেছিলাম। আমরা যখন হাঁটি তখন সারাদিনের ঝিমানো হাতিরঝিল জেগে উঠতে শুরু করেছে, প্রেমিক-প্রেমিকার পদচারণা, মিষ্টি সংলাপ,আলোকোজ্জ্বল বাতিতে সুন্দর হাতিরঝিল আরো অসম্ভব রকমের সুন্দর হয়ে উঠেছে।

ফেইসবুকের বরাত দিয়ে মুখ চেনা কিন্তু সেদিনই প্রথম সাক্ষাৎ, তা-ও কাকতালীয় ভাবে। আলাপের বাক্স খুলতেই জানতে শুরু করলাম তাঁদের সম্পর্কে। যত জানছি ততোধিক শ্রদ্ধা জাগছে তাঁদের, তাঁদের কাজ দায়িত্ববোধের প্রতি। এই অল্প বয়সেই কত ভার টানছে ওরা! ভাবি দায়িত্ব নিতে বয়স কোন ফ্যাক্ট না, ফ্যাক্ট হল দায়িত্ববোধের। বোধটাই মূল কথা। কথা এগিয়ে নিচ্ছি।

তন্বী নিকেতনে থাকে, বাসা বাড়িতে কাজ করে। সেংবিয়া কালাচাঁদপুরে আজং ফাজং এর বাসায়। বটতুল্য এই আজং ফাজং -এর বাসায় থেকেই মাতৃহীনা সেংবিয়া কলেজ পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে। ইন্টার পাশ করে নার্সিং এ যাবে বলে এপ্লাই করেছিল, হয়নি বিধায় এক বছর ইয়ার লস। পড়াশুনায় গ্যাপ গেছে বলে সে কিন্তু বসে নেই, ইতোমধ্যেই বনেদি নগরের সৌন্দর্য শিল্পীর পেশায় নিজেকে যুক্ত করে ফেলেছে। জানতে জানতে তাঁর সম্পর্কে যা জানলাম তা খুবই বেদনাব্যঞ্জক। তাঁরা তিন ভাই বোন। সে সবার চেয়ে বড়। মা হারা এই মেয়েটির বাবা মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারিয়ে গ্রামের বাড়িতে অতি কষ্টে একলা দিন কাঁটান। সতেরো বছরের একমাত্র ছোট বোনটি পরিবারের অমতে বিয়ে করে জামাইয়ের সাথে ঘর করছে। ছোট ভাইটিও অনেক ছোট। আধ-বৃদ্ধ বাবাকে দেখার কেউ নেই। এদিকে ছোট বোন রিতি অন্তঃসত্ত্বা। ছয় মাস চলছে। ঘরে খায় না না খায় কেউ জানে না; অল্প বয়সী ভবঘুরে স্বামীর যত্ন সে পায় না। ডাক্তার বলে দিয়েছে শরীরে প্রচুর রক্ত শূন্যতা রয়েছে। রিতি শুধু অশ্রু কন্ঠে দিদিকে বিকাশে টাকা পাঠাতে বলে। বড় বোন সব বুঝে নেয়। সেংবিয়া টাকা পাঠায় তবে সব সময় পাঠাতে পারেনা। তাঁর নিজের বেতন ই বা কত! সবে তো কাজে ঢুকেছে, ও নিজেও পার্লারের কাজ তেমন জানে না। টিউশনি করার সময় টানাপোড়নের মধ্যেও বাবার জন্যেও টাকা পাঠাতো সে। এখন আর পাঠানো হয় না। ভাবি না জানি বাবাটা গ্রামে কত কষ্টে আছে! ভাবনার আরও গভীরে ঢুকি, একলা মানুষ কত জনের বাঁচার অনুপ্রেরণা স্বপ্ন হতে পারে!

২. ভাবনার ঘোর কাটে যখন তন্বীর ফোনটা বেজে উঠে। কথা শুনে বুঝলাম গ্রাম থেকে মা ফোন দিয়েছে। বাবা নেই। সাংসারিক আলাপ টাকা পয়সার কথা হচ্ছে। মুদির দোকানে বাকি জমেছে, ছোট ভাইটার স্কুল প্রাইভেট ফিস ইত্যাদি নিয়ে আলাপ হল। তেমাথা রাস্তার মোড়ে আসতেই তন্বী রিচার্জের দোকানে গেল, ফিরল কয়েক মিনিট পর। আবার ফোন.. টাকা পাঠাইস্যি! সব বকেয়া শোধ করে দিও। ছোট ভাইটার স্কুল প্রাইভেট ফিসটা দিয়ে দিও; পরে হাতে যা থাকে তুমি হাত খরচ করো আর ছোট ভাই কি খেতে চায় খাইয়ো! এখন রেখে দেই!

লেখক : উন্নয়ন ডি. শিরা, তরুণ প্রবন্ধকার। লেখাটি লেখকের ফেইসবুক নোট থেকে সংগ্রহ করা।

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here