কার্ট কোভেইন
কার্ট কোভেইন। ছবি: ইন্টারনেট।

অং মারমা: কার্ট ডোনাল্ড কোবেইন সঙ্গীতের মহাকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। ১৯৬৭ সাল, ২০ ফেব্রুয়ারী আমেরিকার ওয়াশিংটন শহরের অ্যাবার্ডনে জন্ম নেয় এই পাগলা উম্মাদ শিল্পী। বলা যেতে পারে, মানুষের জীবনবোধ, ওই সময়ের প্রজন্মদের, এমনকি দুনিয়ার এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবির নামই ‘কার্ট কোবেইন’।

ছোট বেলায় ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন। শৈশব ছিলো চিন্তামুক্ত, বাতাসে উড়ে যাওয়া ধুলো-বালির মতো। আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে পূর্ণ ছিলো জীবন। হঠাৎ সাত বছর বয়সে মা-বাবার ডিভোর্স তার জীবনটাকে কঠিন এক বাস্তবতায় এনে ছেড়ে দিয়ে যায়। কার্টের জীবনে নেমে আসে এক বিরাট কঠিন পরিবর্তন। পরিবার ও নিজের সমস্যার জন্যে তিনি পালিয়ে বেড়াতে চেয়েছেন নিজের থেকে নিজে। ইস্কুলের সহপাঠীদের থেকে যত পারা যায়, থেকেছেন দূরে দূরে। মেলামেশা বন্ধ করে দিয়েছিলো একাকীত্ব ছাড়া সবকিছুরই সাথে। হতাশায় ডুবে ডুবে কার্ট কাটাতেন একাকি নির্জনে। এই সুযোগে তার সহপাঠীরা কার্টকে নিয়ে যথেষ্ট মজা নিতো আর ক্ষেপাতো সমকামী বলে।

কার্ট এইসবের ভেতর অতিবাহিত করতে গিয়ে খুব প্যারা খেয়েছিলেন। না পারতেই চোখ রাঙিয়ে তাকানো শুরু করেছেন কার্ট ওই প্রজন্মের দিকে, আর এদের ঘেন্না করতেন মনের ভেতর থেকে। আর নিজ থেকে চাইতেন ঘেণ্ণা দিয়ে এইসব কিছু থামাতে। কিন্তু পারেননি!

পরবর্তীতে তার বাবা ও সৎ মায়ের সাথে কাটাতে গিয়ে তার ভেতরে এক অদ্ভূত পরিবর্তন আসে। যা অনেকেই এই ব্যাপারটাকে পছন্দ করতে না পারলেও কিছু কিছু লোক হৃদয়ে তুলে রেখে দিয়েছেন। মহামতি জন লেনন বোধয় এই ব্যাপারটা নিয়ে এমন একটা কথা বলছিলেন যেটা হলো, “অদ্ভূত না হওয়াটাই আসলে বড় অদ্ভূত।”

‘ফিক্যাল ম্যাটার’ ছিলো কার্ট কোবেইনের প্রথম ব্যান্ড। পরবর্তীতে ‘নির্ভানা’ ব্যান্ড গঠন করেন ক্রিস্ট নোভোসেলিককে নিয়ে। ব্যান্ডটিকে ‘নির্ভানা’ রাখার পেছনের কারণ হিসাবে কার্ট মনে করেন গানও বুদ্ধের ওই নির্বাণেরই মতো। যা মানুষকে মুক্তি দেয়। মূলত সঙ্গীতের মধ্য দিয়েই তিনি এই দুনিয়ার এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে মুক্তির সুর বিলিয়ে দিয়েছিলেন।

নির্ভানার প্রথম অ্যালবাম ‘ব্লিচ’ দিয়ে খুব নাম কামাতে না পারলেও ‘নেভারমাইন্ড’ এর গান দিয়ে বিশাল জনপ্রিয়তা লাভ করেন। হাতে গিটার নিয়ে যা খুশি বাজিয়ে প্রকাশ করতে থাকে উদাসীনতা, ক্ষোভ ও রাগ। আর গলায় বেজে ওঠে দুর্দান্ত সুরে, দুর্দান্ত কথার গান। ভক্তেরা মাথা নাচাতে নাচাতে উন্মাদের মতো ভুলে যেতে থাকে এই অসহ্য দুনিয়াকে, আর ‘নির্ভানার’ সুরের স্রোতে ভেসে যেতে থাকে অচিন কোথাও। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে গিয়ে একদিন ভেঙে যেতে চাইলো এই নির্ভানা…

শিল্প সত্ত্বার সাথে টাকা, জনপ্রিয়তা বিরোধ ধীরে ধীরে কার্টকে মাদক সেবনে ব্যস্ত করে তুলে। ধীরে ধীরে ব্যান্ড, স্ত্রী কার্টনি লাভ সবকিছুকে তুচ্ছ করে কিছুদিন বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করতে থাকলো এই মায়েস্ত্রো। অবশেষে ১৯৯৪ সালের ৫ এপ্রিল মাত্র ২৭ বছর বয়সে এই বুনো সঙ্গীত শিল্পী শর্টগান দিয়ে নিজের কপাল নিজেই ভেঙে দিয়ে এই ফালতু দুনিয়া থেকে নিজেকে বের করে আনলো। যদিও অনেকেই কার্টের এই আত্মহত্যাকে মেনে নিতে রাজি নয়। তারা ভাবেন, এটি একটি হত্যা।

দ্য ডোরস ব্যান্ডের গিটারিস্ট রবি ক্রিগার কিংবদন্তি জিম মরিসনকে নিয়ে একবার বলেছিলেন, “কিছু মানুষ নিজেকে ধ্বংসের মাধ্যমে তার সৃষ্টিসত্ত্বাকে প্রকাশ করেন, জিম এমনই একজন।”

কার্টও হয়তো তেমনই একজন ছিলেন যে কিনা পরে জিম মরিসনের সাথে ২৭ এর ক্লাবে পড়ে গিয়েছেন। নির্ভানা ব্যান্ডের ড্রামার ডেভ গ্রোল পরে বলেছিলেন যে, তিনি জানতেন যে কার্ট তাড়াতাড়ি চলে যাবে পৃথিবী থেকে।

আবার, কার্টের সুইসাইড নোটের ‘নিল ইয়াং’ এর বিখ্যাত সেই কথা- “নিভে যাওয়ার চেয়ে পুড়ে শেষ হয়ে যাওয়া ভালো।”

আজকে কার্ট কোবেইনের মৃত্যু দিবসে এই পৃথিবীর রক মিউজিক শ্রোতারা তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে আর হিংসা করছে তার জীবন দর্শনকে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here