উন্নয়ন ডি শিরা
-লেখক

বিরিশিরি নানা কারণে আমাকে চুম্বকীয় টান টানে, এরমধ্যে একটি সিমসাং নদী। গারো মিথ অনুযায়ী, সিমসাং মাহারীর নামানুসারে এই নদীর নাম হয়েছে ‘সিমসাং’। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সোমেশ্বরী পাঠকের নামানুসারে আগ্রাসী সংস্কৃতি এই নদীর নাম ভোল পাল্টে দিয়েছে ‘সোমেশ্বরী’। সিমসাং নদীকে সোমেশ্বরী নামে পরিচিত করানোর জন্য পাউবো দুর্গাপুর-উৎরাইল সংযোগকারী ব্রিজ সংলগ্ন জায়গায় সাইনবোর্ডে লিখে দিয়েছে ‘নদীর নাম- সোমেশ্বরী’। প্রাচীন ঐতিহ্য, আদিবাসীদের স্মৃতি-বিজড়িত ইতিহাস ঢেকে দেয়ার জন্য রাষ্ট্র প্রশাসনের কত তৎপরতা।

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের বিঞ্চুরীছড়া, বাঙাছড়া প্রভৃতি ঝরনাধারা ও পশ্চিম দিক থেকে রমফা নদীর স্রোত মিলিত হয়ে নেত্রকোনার দুর্গাপুর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে নির্মল, স্বচ্ছসলিলা এই সোমেশ্বরী নদী (সমকাল)। এই সোমেশ্বরী অনেক ইতিহাসের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। সোমেশ্বরী আশেপাশের মানুষগুলোর আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এখানকার কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে সোমেশ্বরীর সম্পর্ক নিবিড়। বর্তমানে গভীর এই সম্পর্ক ভেদ করে ছাড়িয়ে গেছে এখানকার বালু মহলের বন্ধন। বালু অর্থনীতিকদের সাথে সোমেশ্বরীর সম্পর্ক বয়ফ্রেন্ড গার্লফেন্ড্রের মতো। তুমি ছাড়া আমি বাঁচি না টাইপ। বাক্যটি যথার্থ হচ্ছে না বোধয়, বালু উত্তোলনকারী বাঁচবে কিনা জানি না, তবে সোমেশ্বরী তাদেরকে ছাড়াই বাঁচবে, বেঁচে থাকতে পারবে এটি শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যায়।

তো বালু উত্তোলকারী মহলের ২৪ ঘন্টার তৎপরতায় এখানকার মানুষ কত অতিষ্ঠ তা বলে শেষ করা যাবে না। এরআগে আমি বিরিশিরি (ঘোড়াইত)-র একটি বাসায় ছিলাম। সেটির অবস্থান একদম রাস্তা লাগালাগি। বালুবাহী ট্রাক কখন যায়, কখন আসে, কয়টা ট্রাক এল গেল ওই বাসায় বসে সব গোনা যায়। বিরামহীন চব্বিশ ঘন্টা ট্রাক লড়ি চলতেই থাকে। ট্রাক-লড়ির গতির শব্দ আর পেপেত পুপুত হুইসেলে ঘরের মানুষটির বলা কথাও অনেক সময় শোনা যায় না। এখানকার পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা প্রচন্ডভাবে বিঘ্নিত হয়। মানুষগুলো হারাচ্ছে স্বাভাবিক শ্রবণ ক্ষমতা। রাস্তা নির্দিষ্ট মেয়াদের আগেই ভেঙ্গে পড়ছে। এরচেয়েও যে বিষয়টি ভয়াবহ, পরিবেশকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে বিপন্নতার দিকে। এই বিপন্নতার ভয়াবহতা দেখতে এ সপ্তাহে ফের গিয়েছিলাম বিরিশিরি।

ঢাকা থেকে উৎরাইল পৌঁছাই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। তখন মুখ সন্ধ্যা। সবেমাত্র দিনের আলো পশ্চিমে মুখ লুকিয়েছে। হাঁটা পথে যাই বিরিশিরি ঘাট। উদ্দেশ্য কামারখালী। আগে যেখানটায় নিয়মিত ফেরি থামতো তার উত্তরে ঘাট হওয়ায় অন্ধকারে দিক বোঝা যাচ্ছিল না। নতুন অপরিচিত জায়গা একটু থতমত খেলাম। ওদিকে সাথী গুড়িগুড়ি বৃষ্টি। নৌকায় চড়ে ভেতরে ভয় অনুভূত হল। পানিতে স্রোত প্রচন্ড। মাস খানেক আগেও আমি সোমেশ্বরী পাড়ি দিয়েছি। তখন অতো পানি ছিল না। এখন সোমেশ্বরী উত্তাল। সে ফিরে পেয়েছে অনন্ত যৌবন রূপ। এরমাঝেই গন্তব্যস্থল কামারখালী পৌঁছাই। অন্ধকারে হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, তাছাড়া রাস্তাও বা কোথায়? এখানের চলাচলের রাস্তা, অনেক ইতিহাসের স্বাক্ষী প্রাচীন বটবৃক্ষ, বাজার, ভিটে-বসত ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে চলে গেছে। নতুন অপরিচিতরা এখানে চলতে ফিরতে ধন্ধে পড়ে যাবেন।

এরআগে বিগত বিশ-ত্রিশ বছরেও এমন ভয়াবহ ভাঙনের সম্মুখিন হয়নি কামারখালীবাসী। ফলে বসতি বিধ্বংসী এই ভাঙন এখানকার স্থানীয় আদিবাসীরা কীভাবে সামলে উঠবে তা ভেবে কূল কিনারা করতে পারেন না।

আমরা অতি নগন্য দুজন মানুষ আসছি শুনে আগে থেকেই গ্রামের নেতৃস্থানীয়রা অপেক্ষায় ছিলেন। পৌঁছেই সরাসরি যুক্ত হলাম আলাপে। আগমনের কারণ জানিয়ে তাদের কাছ থেকেই জানতে চাইলাম ঘটনার সবিশেষ বর্ণনা। গ্রামের নদী ভাঙন রোধে গঠিত কমিটির প্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল হক (দেশের দুর্নীতি, লুটপাটের বাস্তবতায় তিনি নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা বলে পরিচয় দিতে দ্বিধাবোধ করেন) আলাপের সূত্রপাত করলেন। হক সাহেবের নিজের ভিটে সোমেশ্বরী ভাঙনের কবলে পতিত। ভাঙনের ধাক্কা বসতির মাত্র চার ফুট দূরত্বে এসে আঘাত হানছে। যেকোন সময় বাড়ি পড়ে তলিয়ে যেতে পারে। নদীর ভাঙন রোধে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বালুভর্তি বস্তা ফেলা হয়েছে। কিন্তু সেটি প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য, সমুদ্রে বালু ফেলার মতো। তবু মনের স্বান্তনা! খানিক থেমে আবার বলা শুরু করলেন, ‘কাজ যে হয় না তা না, বালির বাঁধ প্রাইমারী লেভেলের প্রতিরোধ করে। কিন্তু এটি তো আর স্থায়ী সমাধান না। এজন্য স্থায়ী বাঁধ দরকার।’

সোমেশ্বরীর ভাঙন থেকে সম্বল রক্ষার চেষ্টা এক আদিবাসীর। ছবি : লেখক

বালুখেকোদের তাণ্ডবে সোমেশ্বরী রাক্ষসী হয়ে উঠছে। নদী তীরবর্তী মানুষের বসত-ভিটে, বাগান পাড় ভেঙ্গে যাচ্ছে। চোখের সামনে এমন তাণ্ডব দেখেও ভয়ে কেউ কোনো কিছু করতে পারেন না। ওদিকে গারো নারী মহিমা রুগা হাউমাউ করে কেঁদে কেঁদে সবাইকে সাহায্যার্থে এগিয়ে আসার আহ্বান জানায়। কিন্তু রাষ্ট্র গারো নারীর কান্না শুনে না। কান্নার ভাষাও কি আলাদা হয়? গারো নারীর অশ্রু দিয়ে একই জল বেরোয় না? তবে আমাদের দুঃখ-কষ্ট, আর্তনাদের ভাষা কেন রাষ্ট্র-সরকার বুঝে না? আমরা আমাদের অনুভূতির কথাগুলো রাষ্ট্রকে বোঝাতে অক্ষম। যা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আদিবাসী বন্ধু ফারহা তানজিম তিতিল চমৎকারভাবে বিধৃত করেছেন, ‘আপনার প্রয়োজন আপনি ভালো জানেন। আপনি মনোযোগ পাচ্ছেন না। কারণ আপনি নিজেকে ঠিকভাবে তুলে ধরছেন না। নিজেকে অন্যের বোঝার ভাষায় প্রকাশ করুন।’ রাষ্ট্রকে দুঃখ, দুর্দশা, হতাশা, অধিকারের কথা জানাতে হলে রাষ্ট্রের ভাষায় জানাতে হবে। সেই ভাষা আয়ত্ত করা জরুরি।

আমরা সবসময়ই বলি, প্রাণ-প্রকৃতি পরিবেশের সাথে আদিবাসী মানুষের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। নিবিড়তার এই জায়গা থেকেই অনুভব করতে চেষ্টা করি সোমেশ্বরীর বুকের কষ্ট। গর্ভ থেকে সন্তান তুলে নিলে গর্ভবতী যে কষ্ট পান আমি নিশ্চিত সোমেশ্বরীর গর্ভ থেকে বালু তুলে নেয়ায় সোমেশ্বরী ব্যথিত হন। কষ্ট পান। এই ব্যথা বালু মহল কখনো উপলব্দি করেন না। বালু মহলকে সোমেশ্বরী, সোমেশ্বরী তীরবর্তী মানুষের কষ্ট অনুভব করার আহ্বান জানাই।

অল্প সময়ের আলাপে কামারখালীর বিমর্ষ বেদনাতুর মুখগুলোর দিকে তাকাতে সাহস পাইনি। কথা বলার তাগিদেই একদৃষ্টে ছলছল কয়েক জোড়া চোখের দিকে তাকিয়েছিলাম। আমি সেইসব চোখে বাপ-দাদার ভিটে বসত হারানোর দুঃখ, আপদকালীন মূহুর্তে সরকারি সহায়তা না পাওয়ার ক্ষোভ দেখেছি। সেই ক্ষোভ, যন্ত্রনা, হতাশাগুলো যদি আগত দিনে বারুদ হয়ে জ্বলে উঠে? তবে কামারখালীবাসী পাবে রাষ্ট্রের মনোযোগ?

লেখক: উন্নয়ন ডি. শিরা, অ্যাক্টিভিস্ট।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here