কাপ্তাই বাঁধ
ছবি: শিল্পী তুফান চাকমা।

১৯৬০ সালে কর্ণফুলীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে যে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল সেটিই এই মরণফাঁদ কাপ্তাই বাঁধ। নদীর বুকে বাঁধ দেওয়া মানেই তার স্বাভাবিক গতি প্রবাহকে নষ্ট করে তিলে তিলে তার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করা, কর্ণফুলীকে মৃত্যুর মুখে ফেলে দিয়ে বিদ্যুৎ নামক সভত্যার আবিষ্কারকে মানুষের কাছে পৌঁচ্ছে দেয়ার নামে বিংশ শতাব্দীর সময়ে হাজার হাজার মানুষকে করে ছাড়ল বাস্তুহারা, দেশান্তর।

যে কর্ণফুলীকে নিয়ে নজরুল তার কবিতায় বলেছিলেন-

‘‘ওগো কর্ণফুলি, তোমার সলিলে পড়েছিল কবে কার কানফুল খুলি”

আজ সেই কর্ণফুলির নেই নিজস্ব সত্ত্বা ও গতি প্রতিবাহ কর্ণফুলি যেমন হারিয়েছে তার গতিপ্রবাহ ও সত্ত্বাকে, ঠিক তেমনি কর্ণফুলির তীরে বাস করা হাজার হাজার আদিবাসী হারিয়েছে তার পিতৃভূমি, তলিয়ে গেছে হাজার বছরের শৈশব।

তখনকার  কাপ্তাই বাঁধের কারণে উচ্ছেদ হওয়া ছোট্ট এক মারমা পরিবারের করুণ কাহিনী, তা আজ হয়তো অতীত হয়েই আছে শুধু অতীতে। যেগুলো আজ পড়ে আছে অবহেলিত এক কোনায়, জানি না হয়তো একদিন জলের নিচে তলিয়ে যাওয়ার মতো তলিয়ে যাবে সে ইতিহাস। শুধুমাত্র  এই একটি মারমা পরিবারের করুণ কাহিনী নয়, আর কত না কাহিনী রয়েছে এই মরণ ফাঁদ কাপ্তাই বাঁধের পেছনে। যাদের প্রতিটি চোখের জলে ভরে উঠেছে এই বাঁধের পানিগুলো, যার প্রধান কারণ হল এই মরণ বাঁধ কাপ্তাই বাঁধ। একটি কথা না বললেই নয় উদ্বাস্তু হওয়া লোকেদের নিয়ে যতগুলো প্রবন্ধ বা বই প্রকাশ হয়েছে তারমধ্যে একটি বারো উল্লেখ করা নেই উদ্বাস্তু হওয়া মারমা আদিবাসীদের কথা। যারা এখনো খাগড়াছড়ি রামগড়সহ নানা জায়গায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকে ভারতের ত্রিপুরায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছে, এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারে নাই তারা এই মরণফাদ কাপ্তাই বাঁধের কারণে।

পরিবারের কর্তা ছিল সরকারি চাকুরিজীবী, দু’সন্তানের পরিবার মোট চারজন নিয়ে এক সুখি পরিবার। বাঁধের কারণে ধীরে ধীরে নিম্নাঞ্চল ডুবতে  শুরু করল, কয়েকমাস যেতে না যেতেই আরো উচু কিছু জায়গাও ডুবতে শুরু করল। দেখতে দেখতে পানি বাড়ির কিনারায় এসে ঠেকল। এদিকে বউ তার স্বামীকে চাপ দিতে লাগল অন্য জায়গায় চলে যেতে যেখানে নিজের বাপের পরিবারের  স্বজনেরা যেখানে চলে গিয়েছিল। অন্যদিকে স্বামী নিজের পিতৃভূমি (যেখানে মিশে আছে পঞ্চাশ বছরেরও বেশি স্মৃতি) ছেড়ে চলে যেতে পারছিল না। বাধ্য হয়েই ছেড়ে আসতে হলো তার স্মৃতি বিজড়িত সব কিছুকে। চলে আসল আবাসনের নামে অচেনা এক অপরিচিত জায়গায়, যেখানে বলা হয়েছিল দেওয়া হবে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিলীন হওয়া জায়গার সমপরিমাণ জায়গাজমি,পুনর্বাসন করা হবে আর কত কি!

কিন্তু অন্যত্র জায়গায় এসে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে কতটা কষ্টকর পাঠক সমাজেরই বোঝার কথা আর তখনকার সেই অবস্থাতে! কাপ্তাই বাঁধের কারণে মানুষগুলো পেয়েছে ত্যাগের স্মৃতি। কারণ এই স্মৃতিও এক প্রকার পাওয়া!

আদিবাসী সমাজ কি সেই হারানো স্মৃতি থেকে কিছু শিখতে পেরেছে? প্রশ্ন থেকে যায়। আর এ-ও তো  কথা যে, ইতিহাস ইতিহাসই থেকে যায়। ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নিতে চায় না। যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের আদিবাসীদের মতো দুনিয়ার সব আদিবাসীই নিজ দেশের জন্য ত্যাগ করছে দেশ! করতে যে হচ্ছে! আর করাচ্ছেও!

পর্যটন মোটেল থেকে শুরু করে  ইকোপার্ক ফাইভ স্টার হোটেল কিছু বাকি থেকে যায়নি যেগুলো নির্মাণের জন্য আদিবাসীদের জায়গাগুলোকেই বাছাই করা হয়। আর এইসব পর্যটন, মোটেলের কারণে আদিবাসীরা পর্যটকদের কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছে চিড়িয়াখানার পশু-পাখিদের মতো আর পাহাড়ি নারীদের করে তুলছে মোটেলের যৌনদাসী। ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া দেশেই আদিবাসীদের ভাষাকে করা হচ্ছে বিদ্রুপ ব্যঙ্গ কটাক্ষ।

তারপর তাঁরা অজানা অপরিচিত জায়গায় এসে ঠাঁই নেওয়ার সম্বলটুকু না পেয়ে স্থানীয় এক জমিদারের বাড়িতে আশ্র‍য় নেয়। মাথা ঠুকোনোর জন্য বন জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে তুলে কিছু জায়গা। আর তখনিই নেমে আসে এক মহামারী। পরিবারের প্রথম সন্তান (মঃ হথুকে) মারা যায় কলেরায়। নানা রোগে আক্রমণ করে বসল গোটা সদ্য কাপ্তাই বাঁধের কারণে আসা গ্রামের সব পরিবারে। কেউ হারাল ভাই, কেউ হারাল মা, আবার কেউ কেউ হল নিঃসন্তান! কেউবা হারাল পরিবারের সকলকে। যে পরিবারগুলো উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিল খাগড়াছড়িসহ নানা জায়গায় তারা এখন এই দীর্ঘ সময়ে কিছুটা হামাঘুরি দিতে শিখেছে।

আদিবাসী এলাকায় বাঁধ দেওয়া বিশ্বের ইতিহাসে এই প্রথম নয়। নরওয়ের আল্টা বিদ্যুৎ প্রকল্প, ভারতের সরদার সারোভর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কিংবা কানাডার জেমসবে প্রকল্প এ সবকটির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে আদিবাসীদের বসবাসরত এলাকাগুলোকে। আদিবাসী জনপদকে এবং তাদের জমি অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ঘটনা ঘটেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তবে অনেক ক্ষেত্রে করা হয়েছে সঠিক পুনর্বাসন, দেওয়া হয়েছে যথাযথ ক্ষতিপূরণ, তবে তা খুব নগণ্য।

তদ্রুপ বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের পরেও যেসব অঞ্চলে পর্যটন কিংবা বাঁধের পরিকল্পনা করা হয়েছে সেগুলোও আদিবাসীদের বসবাসরত জায়গাতেই! যে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আদিবাসীরা হবে বাস্তুহারা ও উদ্বাস্তু, হতে হবে দেশান্তর। যেমন বান্দবানের মাতামুহুরি বাঁধ, খাগড়াছড়ির নাক্রাই বাঁধ এগুলো সব রাষ্ট্রেরই নীলনকশা, একমাত্র উদ্দেশ্য আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে দেশান্তর করা।

শেষে বলি-

“তুমি নিশ্চয় কাপ্তাই লেকের চিকচিক করা জলকণা দেখেছ

কিন্তু দেখনি সেখানকার বাস্তুহারা মানুষের চোখের জল

নিশ্চয় দেখেছে সেখানকার প্রকৃতি,

দেখোনি রিফিউজি হওয়া মানুষগুলোর প্রতিচিত্র।

শুনেছ নির্গমণের সময় পানির শব্দ,

শোননি সেখানকার বাস্তুহারা মানুষের হাহাকার।’’

লেখক: সাচিং মারমা, তরুণ লেখক।

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here