লেখক। ছবি: নিজস্ব

অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশেও উঠেছে করোনা ঝড়! দিনকে দিন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, এ যেন চালকহীন ট্রেনের মতো, ঝক ঝক ঝক এগিয়ে চলেছে কোন অজানা পথে। প্রথমত চীনে, এরপর একে একে সারা বিশ্বে কর্তৃত্ব চালিয়েই যাচ্ছে মহামারী করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯। যার প্রকোপে বন্ধ হয়ে গেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বড় ছোট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, থমকে গেছে বিশ্ব অর্থনীতি। ফলস্বরূপ পথে বসে গেছেন অনেকেই। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বন্ধ থাকার দরুণ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে বেচাকেনা করতে পারছেনা ক্রেতা-বিক্রেতারা। ব্যবসায়িক লেনদেনের এই গতিপরিবর্তনে এক অর্থনৈতিক অচলাবস্থা তৈরী হয়েছে। যার প্রভাব সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী গারো ও খাসিয়া আদিবাসীদের জীবনে এসেও পৌঁছেছে। প্রান্তিক হওয়ার দরুণ স্বভাবতই এই মানুষদের সামনে অপেক্ষা করছে এক অনিশ্চিত অন্ধকার ভবিষৎ।

পান রপ্তানিতে করোনার তীব্র প্রভাব

বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে বসবাসকারী গারো ও খাসিয়া জনগোষ্ঠীর ষাট ভাগ পান বরজ অর্থনীতির সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে সম্পৃক্ত। এটি অনুমান নির্ভর তথ্য, কম বেশ হতে পারে। কারণ এই দুই জনগোষ্ঠীর গারো সম্প্রদায় অপর চা-বাগান অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত। যেহেতু হাতে সঠিক পরিসংখ্যান নেই সেহেতু হিসেবে গড়মিল হতেই পারে। তা যাইহোক, দেশের চা এবং পান অর্থনীতিতে পুঞ্জিবাসী ব্যাপক অবদান রাখেন এতো সহজ সত্য। করোনা মহামারীর দুঃসহ এই সময়ে পুঞ্জিবাসী কেমন দিন কাটাচ্ছেন? কি খেয়ে পড়ে আছেন? কেমন চলছে পান অর্থনীতি?

খবরের পাতায় চোখ বুলালে বোঝা যায় পান অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত আদিবাসীরা ভালো নেই, যেমন ভালো নেই চা-বাগানে কর্মরত কর্মচারী শ্রমিকের জীবন। বাগানে বাগানে বেতন রেশন না পাওয়ার অভিযোগ সর্বত্র। পার্শ্ব জেলা হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রেমা চা বাগানের শ্রমিকেরা বিগত আড়াই মাস ধরে বেতন রেশন পাচ্ছেন না। বেতন রেশনহীন শ্রমিক জীবন যে কত দুর্বিষহ ভয়ানক মানবেতর হয় সেটি নগরের বনেদীবাসী বুঝবেন না। চা বাগান মালিকেরা এই দুঃসময়ে শ্রমিকদের পাশে না দাঁড়ালেও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া চা শ্রমিক সন্তানেরা সামান্য সামর্থ্য নিয়ে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদ গত শনিবার (২৩ মে) রেমা চা বাগানের চার শতাধিক নিরন্ন শ্রমিকের মাঝে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে। বেতন রেশনের ব্যবস্থা যদি নিশ্চিত করা না যায় বা না হয় তবে দেয় খাদ্য সামগ্রী দিয়ে পাঁচ ছয় সদস্যের সংসার কতদিন চলবে? সংশ্লিষ্ট সবার কাছে এই প্রশ্ন।

এতো কেবল এক রেমা চা বাগানের দুঃখ কথা। এমন অনেক রেমা চা বাগান আছে যেখানকার শ্রমিকেরা কষ্টে কেবল মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।  আবার অনেক বাগান ত্রাণের আওতায় আসলেও যথেষ্ঠ পরিমাণে ত্রাণ পাচ্ছেন না, ত্রাণ পৌঁছানো হচ্ছে না কিংবা পৌঁছানো যাচ্ছে না। তুলনামূলক চা-বাগানের শ্রমিকদের মতোন পুঞ্জির জীবন না হলেও তাদের অবস্থাও শোচনীয়। করেনাকালে পুঞ্জির অর্থনীতিও ভেঙ্গে দুমড়ে মুচড়ে পড়েছে তাসের ঘরের ন্যায়।

ব্যক্তিগতভাবে আমি পুঞ্জির বাসিন্দা। কাজেই পুঞ্জির জনজীবন ছোটবেলা থেকেই খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ ঘটেছে, পূঞ্জীভূত হয়েছে পুঞ্জির জিলাপি অভিজ্ঞতা। করোনার প্রথমদিককার অভিজ্ঞতা। শুরুতেই পান বিক্রি বন্ধ হয়েছে । কেউ বাইরে থেকে পান কিনতে আসছে না, পুঞ্জিবাসীও পান নিয়ে বাইরে বের হতে পাচ্ছে না। তৈরী হয়েছে চতুর্মুখী সংকট। পান বিক্রি করতে না পারার দরুন এক অর্থনীতি নির্ভর পুঞ্জির জীবন এগোচ্ছে এক ভবিষৎহীন অন্ধকারাচ্ছন্ন গহ্বরের দিকে। সমস্যার শেষ এখানেই নয়, সমস্যা আরও আছে। পান উত্তোলনের সঠিক সময়ে যদি পান তোলা না যায় কিংবা না তোলা হয় তবে পান অতি বাত্তি হয়ে পচন ধরবে। ফলে হয়ে পড়বে বিক্রির অনুপযোগী। তখন পান চাষীর আমও যাবে ছালাও যাবে। রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে অতিযত্নে গড়ে তোলা পান বেহুদা পচে আবর্জনা হয়ে থাকবে। শেষ অবধি ছালা যেন না যায় সেটি বিবেচনা করে পুঞ্জিবাসী পান বিক্রি করছেন ঠিকই কিন্তু পানির দরে। এই দুঃসময়ের মাঝেও একটু হলেও স্বস্তির খবর মাঝে আমাদের পুঞ্জিতে (আমুলি পুঞ্জি) ত্রাণ এসেছে কিন্তু এটিও সবার মাঝে বিতরণ করা যায়নি। ত্রাণ সামগ্রীর সীমাবদ্ধতার কারণে পুঞ্জির সবাই ত্রাণ সুবিধা থেকে হয়েছে বঞ্চিত।

করেনাক্রান্ত হবার দু’মাস পর অল্প হলেও পুঞ্জিতে স্বস্তি এসেছে। পুঞ্জিবাসীর সহযোগিতা এবং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আংশিকভাবে পান বেচার কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে। পুঞ্জির প্রবেশ দ্বারে দাঁড়িয়ে বেচাকেনা হয়। এটুকু করতে বাড়তি কষ্ট করতে হচ্ছে। পুঞ্জির প্রবেশদ্বারে আছে উঁচু টিলা। খাঁচা ভর্তি পান নিয়ে উঁচু টিলা বেয়ে উঠতে হচ্ছে ঘরের মহিলাদের। কারণ পুরুষেরা যায় পান তোলার কাজে জুমে। মহিলারা পান গুছি করে ভারী ছট (পুঞ্জিতে খাচাকে বলে ছট) নিয়ে অতিকষ্টে টিলা পাড়ি দিয়ে প্রবেশ দ্বার অবধি পৌঁছান। এতো কষ্টের মাঝেও পান বিক্রি করে শেষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়া যায় না। করোনার প্রভাবে পানে ভালো দাম না পাওয়ায় ফুটে না পান চাষীর মুখের হাসি।

আগেই বলা হয়েছে পান অর্থনীতি পুঞ্জিবাসীর মূল চালিকা শক্তি। শক্তিশালী করোনার প্রভাবে জীবন জীবিকা নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে পুঞ্জিবাসীকে। যে দোড়গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে পুঞ্জিবাসীর জন্যে অপেক্ষমান অনিশ্চিত ভবিষৎ, পুঞ্জির নারীরা রোজ পান বিক্রি করে সেই অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠতে পারবেন?

লেখক: মিখায়েল রেমা, ব্লগার।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here