এবিসিবি’র লগো।

প্রত্যয় নাফাক: বাংলাদেশের গারো জনগোষ্ঠীর ব্যান্ড মিউজিক  নিয়ে কথা বলতে গেলে আপনাকে চলে যেতে হবে এবিসিবি (ABCB বা Achik Band Community Of Bangladesh) এর দিকে। বাংলাদেশের গারো জনগোষ্ঠীর ব্যান্ড মিউজিকে যে সংগঠনের দারুণ ভূমিকা রয়েছে। নিজেদের ভাষায় মিউজিক এগিয়ে নিয়ে যাওয়াকে মূল লক্ষ্য রেখায় রেখে  ২০১৫  সালে আত্মপ্রকাশ হয় এবিসিবি’র। যাত্রাপথে সঙ্গী হয় ৯টি গারো ব্যান্ড দল। প্রতিবছর ইভেন্টভিত্তিক শো’র মধ্যদিয়েই এবিসিবি দীর্ঘ পাঁচ বছর কাজ করে আসছে এবং তরুণ মিউজিশিয়ানদের উদ্বুদ্ধ করছে। আমরা এবিসিবির এই কর্মপরিধির করোনাকালে কেমন ভাটা পরেছে এবং এবিসিবি ভূক্ত ব্যান্ড দলের অবস্থা খুঁজতে কথা বলি বর্তমান প্রেসিডেন্ট কেনি ডেভিড রেমার সাথে।

কথায় উঠে আসে করোনাকালীন  সময়ে গারো ব্যান্ডগুলো আসলে কোন অবস্থায় অবস্থান করছে। আমরা যদি একটু পিছনে ফিরে যাই তাহলে দেখতে পাবো করোনাকালীন অবস্থায়  পুরো বিশ্বজুড়ে যে অর্থনীতির নিম্নমুখী অবস্থা এই অর্থনৈতিক প্রভাব প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে গারো ব্যান্ডগুলোর উপর গিয়ে পরেছে।

ব্যান্ড মেম্বারদের অধিকাংশই যেহেতু স্টুডেন্ট এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘকাল ধরে বন্ধ থাকার কারণে নিজেদের মধ্যে টুকটাক যোগাযোগ থাকলেও মিউজিক রিলেটেড যে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ দরকার সেটা দারুণভাবে ভুগিয়েছে এবং ভোগাচ্ছে। যেহেতু করোনাকালে অনেককে চাকরি হারাতে হয়েছে এবং অনেক ব্যান্ডের মেম্বারদের  অর্থনৈতিক  কারণে ঢাকা ছেড়ে যেতে হয়েছে, ফলে ব্যান্ড দলগুলোর একদম ভিতরকার যে বডি, সেসব জায়গায় ফাটল ধরেছে  এবং ক্রাইটিক্লিস্ট নামের নবীন ব্যান্ড দল ছিটকে পরেছে, সাথে  গারো নারী ব্যান্ড দল ‘ক্রেমলিন’ কেও ভোগাচ্ছে। এই বিষয়ে ক্রেমলিন  এর ড্রামার চিরিং চিসিমের  সাথে আলাপে  বলেন, করোনাকালে আমাদের সব থেকে যে ঝামেলা হয়েছে তা হলো এক সাথে বসতে না পারা। আর যাই হোক গান করতে গেলে এক সাথে বসা খুব জরুরি।

একটি গারো ব্যান্ড দলের পরিবেশনা।

করোনাকালে ব্যান্ড দলের হালচাল বলতে আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন এবিসিবি’র ফাউন্ডিং মেম্বার এবং জুমাং ব্যান্ড দলের ভোকাল রাসং চিসিম মুকুট। কথা বলতে গিয়ে  তিনি বলেন, জুমাং ২০১১ সাল থেকে মিউজিক নিয়ে কাজ করছে। এত বছরের কাজে করোনাকালে নতুন একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। ব্যান্ড দলের অনেককে গ্রামে চলে যেতে হয়েছে, ইভেন আমি নিজেও গ্রামে ছিলাম অনেক দিন। কিন্তু যোগাযোগ রাখতে যা করেছি তা  হলো সাপ্তাহে দুইবার করে অনলাইন মিটিং করেছি এবং এখনো করি। কিন্তু করোনাকালে আমাদের যা ক্ষতি হয়েছে তা হলো আমাদের জুন-জুলাই এর দিকে দুটো গান বের হওয়ার কথা ছিলো, যা পিছিয়ে ডিসেম্বরে চলে গিয়েছে। তবে করোনাকালে জুমাং বসে থাকেনি, অসমাপ্ত কাহিনীর মিউজিক ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করেছে।

করোনাকালে নবীনরা কিভাবে এগোবে এমন আলাপে মুকুট চিসিম বলেন, এই সময়ে সব বাদ দিয়ে যদি মিউজিক নিয়ে বলি তাহলে বলবো এইটা একটা ভালো সময় নিজেকে সময় দেওয়ার এবং খুবি বেশি করে প্র্যাক্টিস করার, যারা গিটার বাজায় বা কীবোর্ড বাজায় তারা আরো ভালো ভাবে মিউজিকে টাইম দিতে পারবে।

নিজেদের ব্যান্ডের বাইরেও এবিসিবি নিয়ে আলোচনায় রাসং বলেন, আমাদের তো আসলে (এবিসিবি) ওরকম কোনো ফান্ড বা পৃষ্ঠপোষক নেই। গারো জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২/১৩ টা ব্যান্ডকে নিয়ে পরিচালনা করতে বা প্রতি বছর বছর শো করতে আমাদের নিজেদের অর্থায়নের দিকেই নজর দিতে হয়। তবে এতকিছুর পরেও এবিসিবি এগোচ্ছে। আমরা চাচ্ছি কিছুদিনের মধ্যে নিজেদের একটি প্রোডাকশন হাউজ তৈরি করতে, যেখানে গারো ব্যান্ড গুলো গান নিয়ে কাজ হবে। এছাড়াও করোনাকালে দীর্ঘদিন ধরে এবিসিবির শো বা ইভেন্ট ভিত্তিক প্রোগ্রামগুলো বন্ধ থাকায় নবীন  দলগুলোর মধ্যে মোরাল এনার্জির  জায়গাগুলো নষ্ট হয়েছে।

কিন্তু এত কিছুর পরেও থেমে থাকেনি এবিসিবি। করোনাকালীন সময়ে নবীন এবং সিনিয়র মিউজিশিয়ানদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে ফেসবুক লাইভ বা গান আড্ডার একটা প্লাটফর্ম  তৈরি করার চেষ্টা করেছে এবং তৈরি করে চলছে। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট  নিজে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেছেন নবীনদের সাথে এবং নানাভাবে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।

এবিসিবি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কথা প্রসঙ্গে উঠে আসলো এবিসিবির আরেক ব্যান্ড দল সাক্রামেন্টের কথা। যারা দীর্ঘদিন ধরে গারো মিউজিক নিয়ে  কাজ করে যাচ্ছেন। সাক্রামেন্ট  করোনাকালে কিভাবে আগাচ্ছে এমন প্রশ্নে ব্যান্ড মেম্বার কেনি ডেভিড  রেমা বলেন, আমরা আসলে সময় কে নেগেটিভ এবং পজেটিভ  ভাবে কাজে লাগাচ্ছি।

এবিসিবির সভাপতি আরও বলেন, আমরা এই করোনাকালে একটা নতুন মিউজিক ভিডিও ‘অতীত স্মৃতি’ নামে  ইউটিউবে আপলোড করেছি। করোনাকালীন সময়ে ব্যান্ড মেম্বারদের একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, সামনা সামনি আড্ডার ও যোগাযোগের কিন্তু আমরা আমাদের এই ঘাটতি মিটিয়ে নিয়েছি প্রতিদিন অনলাইনে আড্ডার মধ্য দিয়ে। নেগেটিভ দিকটা বলতে গেলে বলা যাবে সাক্রামেন্ট গত  তিন চার বছর ধরে একটি অ্যালবাম নিয়ে কাজ করছে যা শেষ হওয়ার কথা ছিলো মার্চ এপ্রিলে, এইটা একটু পিছিয়ে গেছে। আমরা মনে করছি সাক্রামেন্ট করোনাকালীন সময়ে নিজেদের যোগাযোগটা যেভাবে ধরে রেখেছে নবীন ব্যান্ড দলকে এটি অনুপ্রেরণা যোগাবে।

দীর্ঘ পাঁচ বছরের পথ চলায় এবিসিবির ২০২০ সাল ছিল একটা দারুণ সময় যেখানে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিলো পাঁচ বছর পূর্তি কনসার্টের। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় এবিসিবির এই কনসার্ট গারো তরুণ মিউজিশিয়ানদের ব্যান্ড মিউজিকমুখী তৈরির দিকে আকর্ষণীয় জায়গা নিয়ে থাকে। যা তরুণ গারো নারীদের প্রকটভাবে অনুপ্রেরণা জোগায়।

এই করোনাকালীন ভাটায় কিছু আশার আলো দেখিয়েছেন এবিসিবির প্রেসিডেন্ট। কনসার্ট করতে না পারলেও তরুণ কয়েকটি নতুন ব্যান্ড দল যুক্ত হতে যাচ্ছে এবিসিবির সাথে। যেখানে সংখ্যায়  হয়তো  ১৩/১৪ টির মত গারো ব্যান্ড দলের আত্মপ্রকাশ হবে। শুধু এখানে থেমে নেই এবিসিবি, আগামীর  সুদূরপ্রসারী  পরিকল্পনায়  যুক্ত হবে  নতুন কিছু বিষয়। সম্পূর্ণ রূপে এবিসিবিকে এক ফরমাল বডিতে রূপ দেওয়া  হবে  যা ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিকে টার্গেটে রাখছেন নীতি নির্ধারকরা। করোনাকালে ব্যান্ড দলদের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য কনসার্ট করতে না পারলেও আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিটি ব্যান্ড দলকে নিয়ে প্র্যাক্টিস প্যাডে ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি করার  সাথে সাথে নিজস্ব ওয়েবসাইট ডেভেলপ করার মধ্যদিয়ে ব্যান্ড দলের বিভিন্ন ডাটা, গান সংরক্ষণ এবং পরিচিতির অংশটুকু বৃদ্ধি করা হবে। এরমধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ যে পরিকল্পনাটি নিচ্ছে এবিসিবি তা হলো, অনলাইন রেডিও, যেখানে শুধু গারো ব্যান্ড মিউজিক না যেকোনো ধরনের গারো মিউজিকের একটা প্লাটফর্ম তৈরি হবে। শতপ্রতিকূলতার মধ্যেও আশা করা যায় গারো ব্যান্ড দলগুলো এগিয়ে যাবে এবিসিবি’র হাত ধরে। এগিয়ে যাক এবিসিবি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here