স্টাফ রিপোর্টার: আদিবাসী চিরায়ত লোকজ্ঞানে কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস মোকাবেলা সম্ভব বলে মত দিয়েছেন আদিবাসী গবেষক-বিশিষ্টজনেরা। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর), সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় অনুষ্ঠিত ‘আদিবাসীদের চিরায়ত লোকজ্ঞানে করোনা সংকট মোকাবেলা ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠন’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে এ কথা জানানো হয়।

বেসরকারি সংস্থা ইনিস্টিটিউট ফর এনভায়োরনমেন্ট এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইইডি) ও ইউএনডিপি কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ। এসময় তিনি বলেন, ‘আদিবাসীরা স্বাস্থ্য সচেতন। রোগ বালাই থেকে মুক্ত থাকতে তাঁরা অনেক নিয়ম পালন করে। মহামারীর সময় রাখাইন কিংবা মারমা জনগোষ্ঠীর কেউ যদি মারা যান তবে মৃত ব্যক্তির দেহ আগুনে দাহ করে ঘরে ফেরার আগে তিনবার আগুনের উপর দিয়ে আসতে হয়। এরমধ্য দিয়ে তাঁরা জীবানু মুক্ত হয়।’

চলতি মহামারী করোনা ভাইরাসে আদিবাসী মানুষের আক্রান্ত হবার সংখ্যা কম। এর কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘রাজশাহীর পাহাড়িয়া আদিবাসী মহামারী সামাল দেয়ার জন্য একটা পিত্ত পালন করে যেটাকে তাঁরা ‘কুন্টারী আরিয়ান’ বলে। এটি তিন দিনব্যাপী পালিত হয়। এই তিন দিনে পাহাড়িরা তাদের গ্রামকে বন্ধ করে দেন। সেইসময় সেই গ্রামে কোন বহিরাগত প্রবেশ করে না আবার তাঁরাও বাইরে বের হন না। এমনিভাবে গারো জনগোষ্ঠীও ‘দেন মারাং’ আমুয়া পালন করে। যখন কোন এলাকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়ে তখন দেন মারাং আমুয়ার মাধ্যমে ওই গ্রামকে বন্ধ করে দেয়া হয়। খাসিয়ারা একই রকম সামাজিক রীতি ‘খাঙখান দেব সন্নো’ পালন করে। এরমাধ্যমে খাসিয়ারা পুরো গ্রাম বন্ধ করে দেয় যা লোকসমাজে লকডাউন হিসেবে পরিচিত।’

আদিবাসী গবেষক মি: পার্থ আর বলেন, ‘আদিবাসী লোকায়ত জ্ঞান দিয়ে প্রাণ-প্রকৃতি পরিবেশ এমনকি মহামারী প্রতিরোধ করা যায় যা খোদ জাতিসংঘ স্বীকার করেছে। কিন্তু আমরা দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছি, তথাকথিত ক্ষমতাবানেরা আদিবাসী লোকায়ত জ্ঞান ডাকাতি করে কিংবা তাঁর মেধাস্বত্ত্ব অধিকার লঙ্ঘন করে। কিন্তু আদিবাসীদের সম্মতিতে বা অংশগ্রহণে যদি এই জ্ঞানকে ব্যবহার করা যায় তবে আমরা করোনার মতো মহামারী সহজেই প্রতিরোধ করতে পারি।’

চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় বলেন, ‘শহরায়নের ফলে আদিবাসীরা অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছে। পাকা বিল্ডিং ঘরের সুবাদে আদি স্বাস্থ্যসম্মত স্থাপত্য বিধি হারিয়ে গেছে। শহুরেদের সংস্পর্শে পাহাড় অনেক রোগে সংক্রমিত হয়েছে। আদিবাসীদের আদি রীতি, লোকায়ত জ্ঞানকে ব্যাপক পরিসরে প্রয়োগ করা দরকার।’

করোনাকালীন অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্ল্যা বলেন, বান্দরবানে যখন সরকারিভাবে লকডাউন শুরু হয় নাই তখন আদিবাসী গ্রামগুলো স্বেচ্ছায় লকডাউন পালন করেছে। যার ফলে আদিবাসীদের মাঝে করোনার সংক্রমন কম।’

বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব চঞ্চনা চাকমা বলেন, ‘লকডাউনকালে আদিবাসী নারীরা অনেক বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছে। পাহাড়ের গর্ভবতী নারীরা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখিন হয়েছে। একজনের মৃত্যুও ঘটেছে।’

সাংবাদিক মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত ওয়েবিনারে অন্যান্যের মধ্যে অংশ নিয়ে বক্তব্য রাখেন আদিবাসী নেতা ডা. গজেন্দ্রনাথ মাহাতো। পরে এফ মাইনরের সাইড ভোকাল নাদিয়া রিছিলের গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here