৮ নভেম্বর, ২০২০ চিম্বুকের বুকে বসবাসরত প্রায় কয়েক হাজার ম্রো আদিবাসী জনগোষ্ঠী নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত অবস্থায় এবং নিজেদের ট্রেডিশনাল বাদ্যযন্ত্র প্লুং, তম্মা হাতে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়।

শান্তিপ্রিয় সাধারণ ম্রো জনগোষ্ঠী হঠাৎ কেন রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে এর নেপথ্যের কারণ খুঁজতে গেলে আমাদের কিছুটা পিছন ফিরতে হয়। ২০১২ সালের মার্চের ১৮ তারিখের দিকে যেখানে পর্যটক ভর্তি গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয় ম্রো জনগোষ্ঠীর এক শিশু। চিম্বুক বা এর আশেপাশের এলাকায় স্কুল বা শিক্ষার আলো না থাকলেও কখনো গাড়ির আওয়াজ শুনতে না পাওয়া, গাড়ি দেখতে কেমন বোঝতে না পারা ম্রো শিশুকে পিষ্ট হতে হয়েছিলো পর্যটকের গাড়ির তলে। যার সূত্র ধরে বলা যায় কাপ্রু ম্রো পাড়ায় ৬০ একর ভূমি দখল এবং ২০০ ম্রো ও মারমা পরিবার উচ্ছেদ হয়। সেপ্রু পাড়ায় ৬০০ একর জমি দখল এবং ১২৯টি ম্রো পরিবার উচ্ছেদ হয়।

ঠিক একই ধারাবাহিকতায় চিম্বুকের কাপ্রু ম্রো পাড়া থেকে নাইতং পাহাড় পর্যন্ত ৮০০ থেকে ১০০০ জমি দখল করে পাঁচ তারকা হোটেল ম্যারিয়ট এবং পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের পাঁয়তারা শুরু করে সেনা কল্যাণ সংস্থা এবং শিকদার গ্রুপ। আশংকা করা হচ্ছে, এতে প্রায় ২০০ ম্রো পরিবার উচ্ছেদ হবে এবং প্রায় ১০ হাজার জুম চাষি তার জুম জমি হারাবে। এর প্রতিবাদে ৮ নভেম্বর রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার ম্রো।

আলোচনার খাতিরে আমাদের হোটেল ম্যারিয়ট নামের অর্থ, অর্থায়নের পেছনে কি আছে একটু খোলামেলা আলাপ পাড়া প্রয়োজন। খোঁজ নিলে দেখা মিলবে ম্যারিয়ট ইন্টারন্যাশনাল নামে এক আমেরিকান কোম্পানি যারা ১৯২৭ সালে তাদের বিজনেস যাত্রা শুরু করে। শুরুতে হোটেল বিজনেস বা ট্যুরিস্ট বিজনেস না থাকলে পঞ্চাশের দশকের পর এই পথে হাটে ম্যারিয়ট ইন্টারন্যাশনাল এবং বর্তমানে বিশ্বের সব থেকে বৃহৎ ট্যুরিস্ট করপোরেট কোম্পানি গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি। যাদের পুরো বিশ্বের ১৩২টি দেশে ৭৫০০ প্রপার্টি রয়েছে এবং বিশ্বে কর্মী সংখ্যা রয়েছে ১৪৫ মিলিয়ন এবং ব্যান্ড রয়েছে ৩০টির মতো। যাদের এশিয়া অঞ্চলের ২৪টি দেশে ৮২০ট প্রপার্টি রয়েছে এবং ২৩০,৮৯৮ টি ট্যুরিস্ট রুম রয়েছে৷ এশিয়ার অন্তর্ভূক্ত আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ১২৫টি হোটেল এবং ১৫০০টির মত হলিডে রুম নামে রিসোর্ট সার্ভিস রয়েছে। শুধু ভারতে নয় বাংলাদেশেও এই কর্পোরেট কোম্পানির রয়েছে ৫টি হোটেল এবং সাজেকে “সাজেক হিমালয় রিসোর্ট” এবং সিলেটে নাঙকি খাসি হাউস  নামে রিসোর্ট সহ আছে ২১৬টি হলিডে রুম প্রজেক্ট।

কথা রয়ে যায়, বাংলাদেশে এই প্রথম আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি দখল করে পর্যটন কেন্দ্র বা ভূমির মালিকানা কর্পোরেট কোম্পানির হাতে তুলে দিচ্ছে এমন নয় একটু চোখ খুললেই দেখা মিলবে নীলগিরি, নীলাচল, নিলাদ্রি, নীল দিগন্ত, সাইরো, নীল ক্যাফে, চিম্বুক রিসোর্স, ডিমপাহাড়, আলুটিলা, সাজেক এবং আদিবাসী অধ্যুষ্যিত গ্রামগুলোকে বিভিন্ন কায়দায় নামে বেনামে পর্যটন কেন্দ্র করে তুলা হয়েছে বা চেষ্টা করা হচ্ছে।

যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় বাংলাদেশ আর্মির ২৮তম পদাতিক ডিভিশনের ৮০ হাজার সেনা কর্মকর্তা রয়েছেন, সাথে ২৩০টির বেশি সেনা ক্যাম্প; এছাড়া আধা সামরিক পুলিশ বাহিনী রয়েছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে ৬ জন আদিবাসী সিভিলিয়ানের পেছনে ১ জন করে সামরিক বাহিনী নিযুক্ত।

এমন অবস্থায় দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কথা বলে ঋণ খেলাপী একটি দেশীয় কর্পোরেট কোম্পানির সাথে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দ্বায়িত্বে থাকা বাহিনী কিভাবে আমেরিকান কর্পোরেট কোম্পানি যাদের বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের হাজার হাজার প্রপার্টি বৃদ্ধি করছে এমন কোম্পানিকে ধরে নিয়ে আসে পার্বত্য চট্টগ্রামে? এবং স্থানীয় ম্রো জনগোষ্ঠীর পূর্ব পুরুষের ভিটেমাটি বৈদেশিক কর্পোরেট কোম্পানির হাতে ইজারা দেয়?

লেখক: প্রত্যয় নাফাক, সাংগঠনিক সম্পাদক, ছাত্র ইউনিয়ন, চবি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here