নাগরিক (সংশোধনী) বিল বাতিলের দাবিতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল জুড়ে চলছে গণ-আন্দোলন।

ভারত সরকারের নিউ সিটিজেনশীপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল-২০১৬ প্রত্যাহারের দাবিতে সেভেন সিস্টার্সজুড়ে চলছে গণ-আন্দোলন। সাতটি প্রদেশের (আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, অরুণাচল, মিজোরাম, মণিপুরী, নাগাল্যান্ড) বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের সংগঠনগুলো বিল বাতিলের দাবিতে একযোগে রাজপথে নেমেছেন। আন্দোলনের সবচেয়ে বেশি জোয়ার দেখা যাচ্ছে আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড রাজ্যে; এইসব রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত হচ্ছে তীব্র বিক্ষোভ-অবরোধ কর্মসূচি। ঠিক কি কারণে আদিবাসী সংগঠনগুলো নাগরিক (সংশোধনী) বিলের বিরোধিতা করছেন আর তাদের আন্দোলনের সর্বশেষ পরিস্থিতি-ই বা কী এইসব নানা বিষয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আদিবাসী সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গঠিত জোট নর্থ-ইস্ট ফোরাম ফর ইন্ডিজেনাস পিপল’র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও গারোল্যান্ড স্টেট মুভমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান নিকমান সিএইচ মারাক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জনজাতির কন্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক উন্নয়ন ডি. শিরা।

জনজাতির কন্ঠ: কেমন আছেন?

নিকমান সিএইচ মারাক: আন্দোলনের মধ্যে আছি, ভালো আছি।

জনজাতি: স্পষ্ট করে জানতে চাইবো, নাগরিক (সংশোধনী) বিল আসলে কি?

মারাক: আপনার স্পষ্ট কথানুসারে যদি বলি, নিউ সিটিজেনশীপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল হল অমুসলিম অভিবাসীদের নাগরিকত্ব দেয়া। তিনটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিষ্টানদের ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই বিল। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে নতুন এই নাগরিকত্ব বিল তৈরি করা হয়েছে। সংশোধিত বিল অনুযায়ী, এসব ধর্মের লোকজন, যাঁরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া ২০১৪ সালের আগে ভারতে প্রবেশ করেছেন, তাঁদের কারাবন্দী বা বিতাড়িত করা হবে না এবং ভারতে ৬ বছর বসবাসের পর তাঁরা স্থায়ী নাগরিকত্ব পাবেন।

জনজাতি: আপনারা (স্থানীয় আদিবাসীরা) কেন বিলটির বিরোধিতা করছেন?

মারাক: বিলটি ভারতের নিম্নকক্ষ সংসদ লোকসভায় পাস করলেও রাজ্যসভায় পাস করেনি। কিন্তু আগত শীতকালীন অধিবেশনে বিলটি উত্থাপিত হওয়ার কথা রয়েছে। আমরা মনে করি, রাজ্যসভায় এই বিল যদি পাস হয়, তবে বিলটির প্রভাব পুরো ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বসবাসরত স্থানীয় আদিবাসীদের উপর পড়বে। আর তা হবে মরার উপর খাড়ার ঘাঁ অবস্থা।

ভারতীয় নাগরিকত্ব বিল (সংশোধনী) সংক্রান্ত এই বিল আদিম আদিবাসীদের মৌলিক অধিকারে আঘাত হানবে, টুঁটি চেঁপে ধরবে উড়ে এসে জুড়ে বসা সংস্কৃতি। এতে আদিবাসীদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আদিবাসীদের সুপ্রাচীন প্রথা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জীবনধারা হুমকির মুখে পতিত হবে। এই বিল আদিবাসীদের স্বতন্ত্রতা খোয়ানোর এক ভয়ানক যড়যন্ত্র। এরফলে আদিবাসীরা নিজ ভূমিতেই পরবাসী কিংবা সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে।

আরেকটি বিষয়, কেবল ধর্মীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে নাগরিকত্ব প্রদান করা সংবিধানসম্মত বিধি নয়। বিধায় জোট মনে করে, এই বিল পুরোপুরি অসাংবিধানিক, অবৈধ। তা-ই আমরা বিলটির বিরোধিতা করছি।

নর্থ-ইস্ট ফোরাম ফর ইন্ডিজেনাস পিপল জোটের ভাইস-প্রেসিডেন্ট নিকমান সিএইচ মারাক

জনজাতি: সম্প্রতি আপনার রাজ্যের হোম মিনিস্টার জেমস সাংমা গণমাধ্যমে বলেছেন যে, নাগরিকত্ব (সংশোধনী) ‍বিল পাসে মেঘালয়ে কোন প্রভাব পড়বে না।

মারাক: বিজেপি সরকারের আদর্শ তুলে ধরে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটি অসতর্ক দায়িত্ব জ্ঞানহীন, ফাঁকা মন্তব্য বলে মনে হয়। নিজ জাতির ভবিষৎ প্রজন্মের কথা না ভেবে তিনি এমন অসাড় মন্তব্য করেছেন। আগেও বলেছি, এই বিল যদি পাস হয় তবে মেঘালয়ের গারো জনগোষ্ঠীও সংখ্যালঘু হয়ে পড়তে বাধ্য। তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটির প্রেক্ষিতে আমরা জানতে চাই, কোন ভিত্তিতে বা কোন আইনের বলে সরকার স্থানীয় আদিবাসীদের সংখ্যালঘু হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করবে? মেঘালয়ের আদি বাসিন্দাদের সুরক্ষা আইন সম্পর্কে তিনি যেটি বলেছেন, সেটি এখনো রাজ্যে কার্যকর হয়নি। অভিবাসন বিরোধী আইন না হলে আদিবাসী সুরক্ষা রীতিমতো অসম্ভব।

জনজাতি: সরকারের এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে থেকে তিনি যে মন্তব্য করেছেন, তবে কি আমরা এটিই ধরে নেব যে, মেঘালয় রাজ্য সরকার নিউ সিটিজেনশীপ বিল’র সমর্থন করছে?

মারাক: কেবল একজনের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তা বলা যাবে না। তবে সরকার বিলটিকে সমর্থন দিচ্ছে কি না সেটি পরিস্কার করতে হবে। তাছাড়া রাজ্যে অভিবাসীর সংখ্যা কত সেটিও পরিসংখ্যানে আনার পাশাপাশি অভিবাসীদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসের জন্যে ব্যবস্থা করে দিতে হবে। নিজভূমির এক ইঞ্চি মাটিও অভিবাসীদের জন্যে আপস করা যাবে না।

জনজাতি: চলমান আন্দোলনের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন..

মারাক: নিউ সিটিজেনশীপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল বিরোধী আন্দোলন বর্তমানে গণ-আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। বিগত দুদিন ধরে মেঘালয়ে চলছে নাইট রোড ব্লক কর্মসূচি। ভারবাহী ট্র্যাকগুলোর চলাচল বন্ধ রয়েছে। এছাড়াও সাত রাজ্যের বিভিন্ন মেইন পয়েন্টগুলোতে প্রতিদিন লোকজন জড়ো হয়ে প্রতিবাদী বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে। আন্দোলনে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে  আমাদের লোকজন হতাহত হয়েছে। বিল বাতিল করা না হলে পরবর্তী সময়ে আরো কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

জনজাতি: মূল্যবান সময় প্রদানের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ।

মারাক: আপনাকেও ধন্যবাদ।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here